প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ‘২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, রোহিঙ্গাদের জাতিগত নির্মূলের ভয়াবহ পরিকল্পনা রুখে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব ছিল এবং সেই মানবিক কারণেই ২০১৭ সালে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের মানুষ সবসময় মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী, তাই লাখ লাখ নির্যাতিত রোহিঙ্গা যখন জীবন বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে আসে, তখন তাদের ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
সোমবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ড. ইউনূস এ বক্তব্য দেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এতে উপস্থিত ছিলেন। ড. ইউনূস তার বক্তব্যে বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর পরিকল্পিত দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, গ্রাম উজাড় করা, নারী নির্যাতন এবং শিশু হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হয়, যা জাতিগত নিধন ছাড়া অন্য কিছু নয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ নীরব থাকতে পারত না।
তিনি বলেন, “২০১৭ সালে যখন রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম হামলা শুরু হয়, তখন বাংলাদেশ সরকার কোনো রাজনৈতিক লাভের জন্য নয়, কেবল মানবিক বিবেচনায় তাদের আশ্রয় দেয়। আমরা জানতাম, এতে আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে, পরিবেশগত সংকটও তৈরি হবে। কিন্তু লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচানোই তখন জরুরি ছিল।”
ড. ইউনূস আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হচ্ছে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক মানবিক সংকট। কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে এখন প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে, যা স্থানীয় সমাজ ও অর্থনীতির ওপর বিরাট চাপ সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থিত জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর)-এর প্রতিনিধি বাংলাদেশের উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শরণার্থী সংকটগুলোর মধ্যে একটি মোকাবিলায় বাংলাদেশ যে ভূমিকা পালন করেছে, তা মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ বিপুল শরণার্থীকে ধারণ করা কোনো দেশের পক্ষেই সম্ভব নয়, তাই টেকসই সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।
সভায় আরও জানানো হয়, গত আট বছরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার জন্য বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ সম্পদ ব্যয় করেছে। আন্তর্জাতিক দাতাদের সহায়তা থাকলেও তা ক্রমশ কমে আসছে, ফলে সংকট দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীও কর্মসংস্থান ও সম্পদের সংকটে ভুগছে, যা অসন্তোষের জন্ম দিচ্ছে।
ড. ইউনূস তার বক্তব্যে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সমাধানে বৈশ্বিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আমরা কাউকে স্থায়ীভাবে এখানে রাখতে চাই না। তাদের অবশ্যই মিয়ানমারে ফিরতে হবে, তবে সেই প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ। এজন্য আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর চাপ এবং রাজনৈতিক সমঝোতা অপরিহার্য।”
সম্মেলনের সমাপ্তি বক্তব্যে তিনি আবারও পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় ইতিহাসের এক কঠিন সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু এই সংকটের দায়ভার দীর্ঘদিন একা বহন করা সম্ভব নয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বৈশ্বিক সম্প্রদায় একসঙ্গে কাজ করে এই মানবিক সংকটের স্থায়ী সমাধান বের করবে।