প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশে গুমের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মানবাধিকার সংগঠন, ভুক্তভোগী পরিবার এবং আন্তর্জাতিক মহলের চাপের প্রেক্ষাপটে সরকার অবশেষে গুমবিরোধী নতুন আইনের খসড়া প্রকাশ করেছে। এই আইনে গুমের ঘটনাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে আলোচিত ‘আয়নাঘর’ বা গোপন আটককেন্দ্রসহ যেসব স্থানে গোপনে মানুষকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, সেসব ঘটনাও বিচার প্রক্রিয়ার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন আইনের খসড়া অনুযায়ী, গুমের সঙ্গে যুক্ত যেকোনো ব্যক্তি—সে সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কিংবা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী যেই হোক না কেন—তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের এবং বিচারের মুখোমুখি করার বিধান রাখা হয়েছে। আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ, জাতিসংঘের নির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ধারা অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
আইনের প্রস্তাবিত ধারা অনুসারে, গুম একটি বিশেষায়িত অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হবে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। ভুক্তভোগীর পরিবারকে আইনি সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসন সহায়তার নিশ্চয়তা দেওয়ার কথাও খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া, গোপন আটককেন্দ্রগুলো অনুসন্ধানের জন্য বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে বলে জানা গেছে। এই কমিশন অতীতের অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখবে এবং প্রমাণ সাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশে গুমের অভিযোগ উঠলেও কার্যকর তদন্ত ও বিচারের উদ্যোগ দেখা যায়নি। ‘আয়নাঘর’ নিয়ে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তাতে দেখা যায়, বহু ভুক্তভোগী সেখানে আটক থেকে নির্যাতিত হয়েছেন এবং পরে নিখোঁজ হয়েছেন। নতুন আইনে এসব ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে তা গুমের সংস্কৃতি ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন তারা।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সরকার চাইছে একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন আইন প্রণয়ন করতে, যাতে দেশি-বিদেশি সব মহলে আস্থা ফিরে আসে। তিনি বলেন, “গুমের মতো গুরুতর অপরাধকে শাস্তির আওতায় আনতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। নতুন আইন এ ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।”
এদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, সরকারের পদক্ষেপ ইতিবাচক হলেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে বাস্তবায়নে। বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দল দাবি করছে, অতীতের গুমের ঘটনাগুলোতেও দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তিকেই যেন এড়িয়ে যাওয়া না হয়। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল বলছে, বর্তমান সরকারই প্রথমবারের মতো গুমবিরোধী আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক মহলও এই উদ্যোগকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, গুম একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বাংলাদেশে এই অপরাধ মোকাবেলায় নতুন আইনের প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাও আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশে কয়েকশ’ মানুষ গুম হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেককে পরে ফিরে আসতে দেখা গেলেও এখনো বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা বছরের পর বছর ধরে প্রিয়জনদের সন্ধান না পেয়ে দুঃসহ জীবনযাপন করছেন। নতুন আইন প্রণীত হলে এসব ভুক্তভোগী পরিবার আইনি সহায়তা এবং বিচার পাওয়ার পথে একটি বড় পদক্ষেপ এগিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন প্রণয়ন করাই যথেষ্ট নয়; এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীন তদন্ত কমিশন, নিরপেক্ষ আদালত এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। তবে নতুন আইনকে তারা বাংলাদেশের মানবাধিকার অঙ্গনে একটি ইতিবাচক অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছেন।
এই প্রতিবেদনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থার তথ্যের সমন্বয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে। নতুন আইন সংসদে পাস হলে তার বিস্তারিত ধারা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।