ফের সক্রিয় সিন্ডিকেট, লাগামহীন দ্রব্যমূল্য: মধ্যস্বত্বভোগীর দায়ে বাজার অতিষ্ঠ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৫
  • ৫৪ বার
ফের সক্রিয় সিন্ডিকেট, লাগামহীন দ্রব্যমূল্য: মধ্যস্বত্বভোগীর দায়ে বাজার অতিষ্ঠ

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা। একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে; জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর চাপ বেড়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) খুচরা বাজারদরের বিশ্লেষণ এবং বাজার অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যসমূহ থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে শুধু চাল নয়, গত মাসে মসলা, তেল, ডাল, মাছ ও মুরগি—সবকিছুর দাম বেড়েছে; কোনো কোনো ক্ষেত্রে গত বছরের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত উল্লম্ব বৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে। সাধারণ ভোক্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা গেলে বাস্তবে টিসিবির পরিসংখ্যানেও যে দাম বৃদ্ধি দেখা যায়, তা বাজারে আরও বেশি মাত্রায় প্রতিফলিত হচ্ছে।

টিসিবির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মাঝারি জাতের আটাশ চালের দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭.৩৯ শতাংশ বেড়েছে; যেখানে পূর্বে এটি কেজিপ্রতি ৫৫ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে ৬০ থেকে ৭৫ টাকার মধ্যেই দেখা যায়। সরু জাত মিনিকেট ও নাজিরশাইল ধীরে ধীরে ১১.১১ শতাংশ এবং মোটাজাত স্বর্ণা, চায়না ইরি জনিত চালের দাম ৭.৮ শতাংশ উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে আটার দাম ১৪.২৯ শতাংশ, বোতলজাত সয়াবিন তেল লিটারে ১৪.৯৬ শতাংশ এবং পাম অয়েল (লুজ) ১৯.৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ডালের বাজারেও মসুর (ছোট দানা) ১৬.৯৮ শতাংশ উর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে এবং ব্রয়লার মুরগির কেজি দাম বেড়েছে ৭.৫৮ শতাংশ। চরম সংবেদনশীল স্মারক হিসেবে ইলিশের দাম কেজিপ্রতি ২৯.১৭ শতাংশ বেড়ে জনজীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।

বাজারপর্যায়ের প্রত্যক্ষ সূত্রে দেখা গেছে, মাছের দাম সামগ্রিক খাদ্যমূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে চালের পরে দ্বিতীয় বৃহৎ ভূমিকা রাখছে; বিআইডিএসের তথ্য অনুযায়ী মাছ মূল্যস্ফীতির প্রায় ৩৮.৮৭ শতাংশ অংশীদার। মাছ বিক্রেতাদের আক্ষেপ—সাম্প্রতিক তিন মাসে রুইয়ের কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। বর্তমানে বড় সাইজের রুই ৪৫০ থেকে ৪৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে; তার তিন মাস আগের ভাটা ছিল ৩৫০-৩৮০ টাকা। এক কেজি রুইও তিন মাসে ২০০-২২০ টাকার পরিসর থেকে ২৮০-৩০০ টাকায় উঠেছে। এক বছরের ব্যবধানে রুইয়ের প্রতিটি সাইজেই দাম ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় মাছভিত্তিক ভোজনসংস্কৃতির মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। ইলিশে সবচেয়ে তীব্র উত্থান লক্ষ্য করা যায়; গত বছরের তুলনায় কেজিপ্রতি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি হয়েছে—এই ধরনের প্রবণতা মৌসুমী বাজারকে আরও অনিয়মিত করে তুলেছে।

বছরের শুরুতেই—গত বছরের ৮ আগস্ট থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বগ্রহণের পরে—নিত্যপণ্যের দাম কিছু সময় সহনীয় পর্যায়ে ছিল এবং রমজানকালে মূল্যবৃদ্ধির লক্ষণও দেখা যায়নি; ফলে জনগণ আপাতত স্বস্তি অনুভব করেছিল। কিন্তু গত জুনের পর থেকে বিশেষত জুলাই-আগস্টে বাজারে ধাক্কা খেয়েছে। সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ যেমন ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস) ও সাশ্রয়ীমূল্যে পণ্যের বিক্রি—এসব সত্বেও মূল্যবৃদ্ধির ধারা বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সরকারি পর্যবেক্ষণ ও স্বাধীন অনুসন্ধানগুলি বলছে—মূল সমস্যা সরাসরি উৎপাদন বা আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি নয়, বরং মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের কূটকৌশল এবং অর্থনৈতিক দৌরাত্ম্য।

অন্তঃস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা হওয়া এক নিবিড় প্রতিবেদন অনুসারে, অতিরিক্ত মুনাফার লোভ ও সরকারের সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে কয়েকটি উচ্চ-প্রভাবশালী মধ্যস্বত্বভোগী ফের সক্রিয় হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা ট্রানজিট লজিস্টিক, পাইকারি অনিয়ম, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং বিক্রয় চেইনে বর্তমান নিয়মিত চক্রে চিরায়তভাবে সুযোগ করে নেয়—ফলে উৎপাদনকৃত মাল সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে ব্যাহত হয় এবং খুচরা পর্যায়ে মূল্য দ্বিগুণ বা ততোধিক বাড়ে। তদন্তকারী দল দেশের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনকারী জেলা থেকে ঢাকার আড়ত পর্যন্ত ট্র্যাকিং করেছে; বগুড়া, কুমিল্লা, নরসিংদী ও যশোর থেকে সবজি; দিনাজপুর, শেরপুর ও নওগাঁ থেকে চাল; পাবনা থেকে দেশি পেঁয়াজ; চট্টগ্রাম খাতুনগঞ্জ ও বেনাপোল থেকে আমদানিকৃত পণ্যের পথে অনুসন্ধান চালানো হয়। মাঠ পর্যায়ে কৃষকের উৎপাদনমূল্য, স্থানীয় বাজারদর, পরিবহন খরচ, আড়তের পাইকারি মূল্য, প্যাকেজিং, শ্রম ও কমিশনসহ চাঁদাবাজি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে রিপোর্ট নির্মিত হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে যদিও মহাসড়কে সরাসরি চাঁদাবাজির প্রমাণ সর্বত্র মেলে না, ট্রাক ভাড়া সংগ্রহ, স্ট্যান্ড-ভিত্তিক দালাল কার্যক্রম ও অননুমোদিত ওভারলোডিং—এসবেই দামের অস্বাভাবিকতা তৈরি হচ্ছে।

রাস্তাঘাটে চাঁদাবাজির উপরে অতিমাত্রায় ভর করে সবকিছু বোঝানো গেলেও প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—বাজারে শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার পেছনে মূল চালিকা শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। তারা উৎপাদন ও আমদানিতে সরাসরি যুক্ত না থেকেও মধ্যস্থতার মাধ্যমে বড় ধাপের লাভ অবস্থান করছে; আড়তদার বা কিছু অনামী ব্যক্তিরা কমিশন দিয়ে দাদন করে দাম বাড়াচ্ছে। এমনকি কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর কাছে পণ্য সরবরাহের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার কথাও উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে—করপোরেট হাউসগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে আসার ফলে চালের মৌসুমে ও সাপ্লাই রয়েছে এমন পরিবেশে ওরা দামের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে বাজারকে মসৃণভাবে স্থিতিশীল করতে ব্যর্থ করছে।

বাজারের কিছু সূত্র ও আমদানিকারকদের বক্তব্যও এই অভিযোগের স্বপক্ষে যায়। বেনাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি জানিয়েছেন, ভারতের নির্দিষ্ট পণ্যের স্থানীয় বন্দরের দাম হিসেব করলে তা বাজারে অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃত্রিমভাবে মূল্য নির্ধারণ করে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করছে। রাজধানীর প্রধান পাইকারী বাজার বাবুবাজারের কিছু শক্তিশালী এজেন্টও বলছেন, চাতাল ব্যবসা এখন করপোরেট নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে; সেই নিয়ন্ত্রণ যেন রহস্যময় ও নিয়ন্ত্রনশীল—যদি তার সুষ্ঠু তদারকি না করা যায়, সরকার যে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করুক বাজার শিথিল হবে না।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব)-এর পরিচালকরা বলছেন, মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের লেনদেনে নানা অস্বচ্ছতা ও কমিশন-ভিত্তিক দদন বাজারকে অতিষ্ঠ করছে। তাদের মতে, আড়তদার বা মধ্যস্থতাকারীরা কোনো উৎপাদন বা আমদানিতে সরাসরি বিনিয়োগ না করলেও তারা কমিশন-এজেন্ট হিসেবে বড় অঙ্কের লাভ আদায় করছে—এই অবস্থা ছাড়া ন্যায্য প্রতিযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। যেমনটি তারা উল্লেখ করেছেন, করপোরেট গ্রুপ ও স্পেশালাইজড ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন দফায় দাদন ও কমিশনের মাধ্যমে পণ্যচেইনকে প্রভাবিত করছে—এভাবেই বাজারের স্বাভাবিক গতিধারা ব্যাহত হচ্ছে।

অর্থনৈতিক সূচকগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরে সরকারি রিপোর্টে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শুরুর দিকে মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে ছিল; ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ১১.৬৬ শতাংশ ছিল, তা ক্রমান্বয়ে কমে বর্তমানে আড়াই আট শতাংশের কাছাকাছি নেমেছে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বৃদ্ধি ও ডলারের দরপতন বন্ধ হওয়া ইতিবাচক সংকেত দিয়েছে; বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্যের দামেরও কিছুটা হ্রাস দেখা যায়। ট্যারিফ কমিশনের ১৮ আগস্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী থাইল্যান্ডে ভাঙা চালের মেট্রিকটনপ্রতি দাম গত এক বছরে ৩৮ শতাংশ কমে ৩৮১ মার্কিন ডলারে এসেছে; অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম নিম্নগামী হওয়ায় ঘরোয়া মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেশীয় সরবরাহ শৃঙ্খলের অসুবিধা ও কারসাজি-ভিত্তিক বলে বিচার করা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে বাজার স্থিতিশীলকরণের জন্য প্রতিবেদনে সুপারিশসমূহও উপস্থাপন করা হয়েছে: মধ্যস্বত্বভোগীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা, লজিস্টিক ও পরিবহন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানো, পাইকারি ও খুচরা চেইনে ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা, আড়ত-নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বৃদ্ধি এবং আমদানি-রপ্তানি রুটে কার্যকর তদারকি। নীতিনির্ধারকরা জানাচ্ছেন, যদি মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে চুড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তাহলে দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা কেবল বাক্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে; বাস্তবে মূল্যপরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। একই সঙ্গে ভোক্তা সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নীতিগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপরও জোর দেয়া হয়েছে।

সরকারি এবং বেসরকারি উভয় পর্যায়েই বিশ্লেষকরা বলছেন—অর্থনীতির মৌলিক সূচক ইতিবাচক সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ বাজার নিয়ন্ত্রণ না পেলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমবে এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে। বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধু ভৌত উদ্যোগ নয়, রাজনৈতিক ঐক্য, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও ব্যবসায়ীদের জবাবদিহিতার একটি সুষম কাঠামো দরকার—আজকের অবস্থা প্রমাণ করে যে শুধুমাত্র আহ্বান বা অস্থায়ী পদক্ষেপ দ্বারা কার্যকর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এজন্য অনুকূল নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নিয়মতান্ত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণে নীতিনির্ধারক সম্প্রদায়কে সন্তর্পণে এগিয়ে আসতে হবে, নইলে প্রতিদিনের রুটিন জীবনযাত্রায় সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বড় মূল্যটুকু পরিশোধ করতে বাধ্য হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত