প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম ব্যস্ত মহাসড়ক কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক সড়কের কুমিল্লা অংশ ক্রমেই মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এ সড়ক দিয়ে চলাচল করলেও অব্যবস্থাপনা, সরু রাস্তাঘাট, অদক্ষ চালক এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে অহরহ। গত এক বছরে কেবল কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট থেকে কালামুড়া ব্রিজ পর্যন্ত ৪২ কিলোমিটার সড়ক অংশে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪০ জন। এ সময় আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ, যাদের অনেকেই চিরদিনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।
সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সড়কটি দুই লেনবিশিষ্ট, সরু ও আঁকাবাঁকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যানবাহনের চাপ ও চালকদের বেপরোয়া গতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নকশাগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি চালকদের দক্ষতা ও পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এই মৃত্যুমিছিলের বড় কারণ। সড়কের প্রতিটি মোড়েই রয়েছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
এই মহাসড়ক কেবল কুমিল্লা বা সিলেট নয়, আশপাশের বেশ কয়েকটি জেলার মানুষের রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের অন্যতম ভরসা। জীবিকা নির্বাহ থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রতিদিনকার জীবনযাত্রা এ সড়কের ওপর নির্ভরশীল। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কই আজ মানুষের জীবনের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সিলেটগামী যাত্রীদের এ মহাসড়ক দিয়েই যেতে হয়। বহু বছর ধরে এই সড়ক চার লেনে উন্নীত করার দাবি থাকলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়নি। মূল পরিকল্পনা ছিল ময়নামতি সেনানিবাস থেকে ধরখার পর্যন্ত প্রায় ৫৪ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করার। তবে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত উন্নয়ন চুক্তি বাতিল হয়ে যাওয়ায় প্রকল্পটিও থমকে যায়। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর জানিয়েছে, নতুন প্রকল্প নেয়ার জন্য তারা দাতা সংস্থা খুঁজছে। প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। সরকারি অর্থায়নে হলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার চিন্তা রয়েছে।
এদিকে আজ বুধবার স্থানীয় বাসিন্দারা মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার দাবিতে মানববন্ধন করেন। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ক্যান্টনমেন্ট থেকে কংশনগর পর্যন্ত দেবপুর, রামপুর, পারুয়ারা, পশ্চিম সিংহ, কংশনগর ও জাফরগঞ্জ এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয় সমাজকর্মী শাহজালাল আল-নাগর বলেন, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালকরাই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বুড়িচং উপজেলার দেবপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শহীদুল্লাহ প্রধান বলেন, রাস্তাটি এত সরু যে দুটি বাস পাশাপাশি চলাচল করতে পারে না। অধিকাংশ দুর্ঘটনা ওভারটেকিংয়ের সময়ই ঘটে। একইভাবে ময়নামতি হাইওয়ে থানার ইনচার্জ ইকবাল বাহার মজুমদার স্বীকার করেন, দুই লেনের সীমাবদ্ধতার কারণেই দুর্ঘটনার হার বেশি।
কুমিল্লা সড়ক ও জনপথ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, রাস্তাটিকে চার লেনে উন্নীত করার জন্য জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চলছে। নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলেন, ভারতের সঙ্গে প্রকল্প বাতিল হওয়ায় নতুন দাতা সংস্থা খোঁজা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বর্ষাকাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত বড় ধরনের কাজ শুরু করা সম্ভব নয়, তবে জরুরি সংস্কারের কাজ শিগগিরই শুরু হবে।
স্থানীয় মানুষের দাবি, অবিলম্বে সড়কটিকে চার লেনে উন্নীত করতে হবে, নইলে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়ক দেশের অর্থনীতির জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মানুষের জীবনের জন্যও অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই সড়কে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি পরিবারে শোক ও দুঃখের ছাপ রেখে যাচ্ছে।