প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে চলমান হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ে বহুদিন ধরে যে অচলাবস্থা বিরাজ করছিল, তা নিরসনে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি ও বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে নতুন করে অঙ্গীকার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিজিবি সদর দপ্তরে চার দিনব্যাপী ৫৬তম মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন শেষে প্রকাশিত যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের নির্বিচারে গুলি, নির্যাতন ও হামলার ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনার বিষয়ে উভয়পক্ষ একমত হয়েছে।
বৈঠকে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিএসএফ গুলিতে অন্তত ১৫ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে শিশু ও অপ্রাপ্তবয়স্কও রয়েছে। তিনি দিনের আলোতে ও প্রকাশ্যে নিরীহ মানুষ হত্যার ঘটনার নিন্দা জানান এবং প্রশ্ন তোলেন—শিশুরা কিভাবে সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে।
অন্যদিকে বিএসএফ মহাপরিচালক দালজিৎ সিং চৌধুরী দাবি করেন, অনেক সময় অনুপ্রবেশকারীরা ধারালো অস্ত্র নিয়ে বিএসএফ সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। শুধু চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ৩৫ জন সদস্য আহত হয়েছেন। তিনি জানান, বিএসএফ সদস্যরা প্রথমে সতর্ক করে, তারপর বাধা দেয় এবং সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে গুলি চালানো হয়। তবে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে সীমান্তে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত টহল জোরদার করা হবে।
সম্মেলনে উভয়পক্ষ সীমান্তে সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম জোরদার, সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো, অপরাধীদের অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ এবং সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড পরিহার করার ব্যাপারে একমত হয়। এছাড়া আন্তঃসীমান্ত বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও সন্ত্রাসীদের বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়।
এবারের বৈঠকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল অবৈধ অনুপ্রবেশ ও রোহিঙ্গা পুশ-ইন। বিজিবি মহাপরিচালক ভারতের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা ও অনাকাঙ্ক্ষিত নাগরিকদের বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর প্রবণতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বৈধ প্রক্রিয়া মেনে প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানান। জবাবে বিএসএফ মহাপরিচালক বলেন, পুশ-ইন প্রক্রিয়া আইন অনুযায়ী এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই সম্পন্ন হচ্ছে। তিনি জানান, ইতিমধ্যে ৫৫০ জনকে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং ২ হাজার ৪০০ কেস যাচাইয়ের কাজ চলছে।
সম্মেলনে সীমান্ত দিয়ে মাদক, অস্ত্র, স্বর্ণ, জাল নোট এবং বিস্ফোরক দ্রব্য পাচার প্রতিরোধে ‘সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। উভয়পক্ষ পাচারকারীদের তথ্য ভাগাভাগি করার পাশাপাশি যৌথভাবে চোরাচালানবিরোধী অভিযান চালানোর বিষয়ে একমত হয়।
এছাড়া সীমান্ত শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে পূর্ব অনুমতি ছাড়া কোনো উন্নয়ন কাজ না করা, চলমান প্রকল্প দ্রুত শেষ করা এবং যৌথ নদী কমিশনের অনুমোদন ছাড়া সীমান্তবর্তী নদীতে অননুমোদিত কাজ বন্ধ রাখার বিষয়েও সম্মতি হয়। উভয় দেশ গণমাধ্যমকে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানায়, যাতে সীমান্তে অযথা উত্তেজনা সৃষ্টি না হয়।
চার দিনব্যাপী এ সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, নৌপরিবহন ও সড়ক বিভাগসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অংশ নেন। ভারতীয় প্রতিনিধিদলে বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ভারতের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
সম্মেলনের শেষ দিনে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দুই মহাপরিচালকই সীমান্ত পরিস্থিতি উন্নত করার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তারা জানান, ভবিষ্যতে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা এবং তথ্য বিনিময় আরও জোরদার করা হবে।










