প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা। একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার অগ্রদূত হিসেবে ৩৫ বছরে পদার্পণ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘযাত্রায় একাডেমিক উৎকর্ষ, উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মিশ্রণ ঘটিয়েছে, যা দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শিক্ষাঙ্গনে এক আলোকবর্তিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৯১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুতে মাত্র তিনটি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে সাতটি অনুষদের অধীনে ২৮টি বিভাগ রয়েছে। অর্থনীতি, রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞান থেকে শুরু করে বর্তমানে বিজ্ঞানের আধুনিক বিষয় এবং সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে বিস্তৃত এই বিদ্যাপীঠের শিক্ষার দিগন্ত দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে। শাবিপ্রবি দেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ক্রেডিট পদ্ধতির শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছে এবং আধুনিক ভাষা ও তথ্য প্রযুক্তি নামে দুটি ইনস্টিটিউটের পাশাপাশি সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের মাধ্যমে উচ্চমানের বিজ্ঞান শিক্ষা প্রদান করছে।
শুরুতে ১০০ শিক্ষার্থী ও ১৩ জন শিক্ষক নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে প্রায় ৮,০০০ শিক্ষার্থী এবং ৬০০ শিক্ষকের সঙ্গে ৭০০ কর্মকর্তার সার্বক্ষণিক সেবায় প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে চলছে। শিক্ষার্থীরা শুধুমাত্র পাঠ্যক্রমে নয়, বরং উদ্ভাবন ও গবেষণার ক্ষেত্রে দেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। ২০০৯ সালে দেশে প্রথমবারের মতো এসএমএসভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতি চালু হয়েছিল শাবিপ্রবিতে, যা পরে সারাদেশে বিস্তৃত হয়। শিক্ষার্থীরা তৈরি করেছে প্রথম বাংলা সার্চ ইঞ্জিন ‘পিপীলিকা’ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক ‘একুশে’ কী-বোর্ড, যা প্রযুক্তিতে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যৌথভাবে উদ্ভাবন এবং গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। মাত্র ১০-২০ মিনিটে ক্যানসার শনাক্ত করতে সক্ষম প্রযুক্তি তৈরি করেছেন শিক্ষকরা। শিক্ষার্থীরা তৈরি করেছে স্বয়ংক্রিয় গাড়ি ‘অটোমামা’, কথা বলা রোবট ‘রিবো’, হাঁটতে পারে রোবট ‘লি’ এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য স্বল্পমূল্যের ই-ব্রেইল প্রযুক্তি। এ ছাড়া ‘প্রীতিলতা’সহ শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী আইডিয়া এখন বাজারেও জায়গা করে নিয়েছে।
গবেষণায় শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক সাফল্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত। ২০১৯ সালে নাসার ‘মহাকাশ অ্যাপস চ্যালেঞ্জ’-এ শাবিপ্রবির ‘টিম অলিক’ বিশ্বসেরা চারটি দলের মধ্যে একটি হিসেবে নির্বাচিত হয়। ২০২০ সালের জাতীয় প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় ‘ডিফাইন কোডার্স’ চ্যাম্পিয়ন হয় এবং ২০২৩ সালে যুব গণিত চ্যালেঞ্জে স্বর্ণপদক অর্জন করে। এছাড়া আইসিপিসি এশিয়া-পশ্চিম আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় ‘ফ্যানাটিকস’ দল চ্যাম্পিয়ন হওয়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক কৃতিত্ব প্রমাণ করে।
শাবিপ্রবির ইলেকট্রোকেমিস্ট্রি অ্যান্ড ক্যাটালাইসিস রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে শিক্ষার্থীরা গত ১০ বছরে ১২৫টির বেশি গবেষণা প্রকাশ করেছে। প্রতিবছর শিক্ষকদের তিন শতাধিক গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়। ২০২৪ সালে সিমাগো র্যাংকিংয়ে গবেষণায় দশম এবং সামাজিক প্রভাবে চতুর্থ স্থান অর্জন করে শাবিপ্রবি। কিউএস র্যাংকিংয়ে দেশে শীর্ষে অবস্থান নিশ্চিত হয়েছে।
৩২০ একরের সবুজ, টিলাবেষ্টিত ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের জন্য এক অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বনজ গাছ, লতা-পাতা, ছোট টিলা এবং দৃষ্টিনন্দন লেক ক্যাম্পাসকে প্রাণবন্ত করেছে। শহীদ মিনার, শহীদ রুদ্র সেন লেক ও শাহজালাল কর্নারের মতো স্থানগুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও ইতিহাসচেতনা জাগ্রত করে।
শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা শুধু একাডেমিক ও উদ্ভাবনে নয়, সাংস্কৃতিক ও সহ-শিক্ষামূলক কার্যক্রমেও সক্রিয়। অর্ধশতাধিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও দক্ষতাভিত্তিক সংগঠন শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জুলাই অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীরা সাহসী ভূমিকা পালন করেছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন ও স্বৈরাচার পতন আন্দোলনে শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। শহীদ রুদ্র সেনের স্মরণে প্রধান ফটকের নামকরণ এবং নতুন লেকের নামকরণ তার সাহসিকতা ও ত্যাগকে প্রজন্মের কাছে জীবন্ত রাখে।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে ইতিমধ্যেই বিশটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যা দুই বছরের মধ্যে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, গবেষণা ও ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করবে। নতুন ১৩টি বিভাগের অনুমোদন, গবেষণার জন্য তহবিল বৃদ্ধি এবং আধুনিক ইলেকট্রনিক হাব গঠনসহ পরিকল্পিত পদক্ষেপ বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানের সেন্টার অব এক্সেলেন্স হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
শাবিপ্রবি শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, উদ্ভাবন, গবেষণা, সাংস্কৃতিক সমন্বয় এবং সবুজ ক্যাম্পাসের মাধ্যমে দেশের শিক্ষাজগতে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে উচ্চশিক্ষার এই প্রতীক ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুধু দক্ষই নয়, নৈতিক ও সৃজনশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলছে।