প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
রোহিঙ্গা সংকট ক্রমেই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিচ্ছে, তবে আঞ্চলিক জোট আসিয়ান এখনো কার্যকর কোনো ভূমিকা নিতে পারছে না—এমন অভিযোগ তুলেছে আসিয়ান পার্লামেন্টারিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস (এপিএইচআর)। ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি জানিয়েছে, রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণকে আসিয়ান দীর্ঘদিন ধরেই উপেক্ষা করছে, ফলে পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই এক সংকটজনক পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
এপিএইচআরের প্রতিনিধিদল সম্প্রতি কক্সবাজারে শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শন করে বাস্তব পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘ আট বছর ধরে রোহিঙ্গারা মানবেতর জীবনযাপন করছে, অথচ তাদের প্রত্যাবর্তন কিংবা পুনর্বাসনের বিষয়ে আসিয়ান কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়নি। ফলে শিবিরগুলোতে মানব পাচার, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানসহ নানা অপরাধ প্রবণতা বেড়ে চলেছে, যা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
সংবাদ সম্মেলনে এপিএইচআরের সহসভাপতি ও মালয়েশিয়ার সাবেক সংসদ সদস্য চার্লস সান্তিয়াগো বলেন, “রোহিঙ্গা সমস্যা শুধু বাংলাদেশের নয়, এটি আসিয়ান অঞ্চলেরও সমস্যা। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে কেবল প্রত্যাবাসন। এখানে চীনের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন প্রকাশ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিরোধিতা করছে না, বরং তারাও একটি স্থায়ী সমাধান চায়।” তিনি আরও বলেন, আসিয়ান যদি এখনই উদ্যোগ না নেয়, তবে মানব পাচার ও অবৈধ বাণিজ্যের মতো সমস্যা গোটা অঞ্চলকে বিপর্যস্ত করবে।
এপিএইচআর জানিয়েছে, বর্তমানে কক্সবাজারের ক্যাম্পে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা বাস করছে। কিন্তু বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) সাম্প্রতিক সতর্কবার্তা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরের পর খাদ্য রেশন বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যদি প্রতি মাসে অন্তত ১৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তহবিল জোগাড় না হয়। এতে লাখো মানুষ ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মুখে পড়বে। এ প্রেক্ষাপটে তারা আসিয়ানকে অবিলম্বে একটি মানবিক তহবিল গঠনের আহ্বান জানিয়েছে।
মালয়েশিয়ার সংসদ সদস্য ওং চেন বলেন, “রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক, আর মিয়ানমার যেহেতু আসিয়ানের সদস্য রাষ্ট্র, তাই অন্য সদস্য দেশগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে শরণার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা ছাড়াও আসিয়ান রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের দায়িত্ব নিতে হবে।” ফিলিপাইনের সাবেক কংগ্রেস সদস্য রাউল ম্যানুয়েলও একই সুরে বলেন, রোহিঙ্গা যুবকদের শিক্ষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না হলে তারা চরম হতাশায় নিমজ্জিত হবে, যা ভবিষ্যতে আরও অস্থিতিশীলতার জন্ম দেবে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা স্পষ্ট করে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের কেবল আশ্রয় দিয়ে রাখা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। প্রত্যাবাসনের জন্য রাজনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া ছাড়া এই সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। বাংলাদেশ একা এই বোঝা বহন করতে পারবে না, তাই আসিয়ানসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে।
আসিয়ান হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোট, যা ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষাই এর অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু রোহিঙ্গা সংকটের মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় আসিয়ানের অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।
এপিএইচআরের এই সতর্কবার্তা আবারও মনে করিয়ে দিল যে রোহিঙ্গা সমস্যা আর শুধু সীমান্তবর্তী সংকট নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবিকতার এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।