ওবায়দুল কাদেরের তদবিরে রক্ষা পেলেও এবার বেরিয়ে আসছে সালমার থলের বিড়াল

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৫৮ বার
ওবায়দুল কাদেরের তদবিরে রক্ষা পেলেও এবার বেরিয়ে আসছে সালমার থলের বিড়াল

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

নোয়াখালী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর সালমা আক্তারের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। প্রায় আড়াই বছর কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির কোটি টাকার সম্পদ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে সাম্প্রতিক তদন্তে উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থেকে পার পেয়ে গেলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তদন্ত তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন করেছে।

প্রায় ৩১ মাসের দায়িত্বকালে সালমা আক্তার শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, শিক্ষার্থীদের ভর্তি বাণিজ্য থেকে শুরু করে সহকর্মীদের সম্মানি আত্মসাৎ, এমনকি কলেজের কক্ষ ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির মতো কাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যুগান্তরে ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রথমবার জনসমক্ষে এলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সেসময়ের ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের তদবিরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযোগের ফাইল ধামাচাপা দেয়। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন উদ্যোগে তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দুর্নীতির এই কাহিনি ফের সামনে চলে আসে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, “দুদক যদি যথাসময়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিত, তবে নোয়াখালী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আজ জেলের অন্ধকার কক্ষে থাকতেন। একজন শিক্ষক যখন মানুষ গড়ার কারিগরের জায়গা থেকে সরে গিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন, তখন তা সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় কলঙ্ক।”

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে বিস্তৃত দুর্নীতির চিত্র। দায়িত্বকালীন সময়ে তিনি দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান শাখায় আসন সংখ্যার বাইরে ২৩৭ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করে প্রায় এক কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। শুধু তাই নয়, কলেজের জুনিয়র সহকর্মীর প্রাপ্য ৫৯ হাজার টাকার সম্মানি নিজের হিসাবে তুলে নেন। খেলাধুলা, উন্নয়ন, বিজ্ঞান ক্লাব, লাইব্রেরি, সাহিত্য-সংস্কৃতি, রেড ক্রিসেন্ট, চিকিৎসা, ম্যাগাজিন এবং আইটি ফান্ডসহ কমপক্ষে ২২টি খাত থেকে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, নম্বরপত্রে জালিয়াতি, এমনকি কলেজ ক্যাম্পাসে গরুপালনের মতো অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ডের কথাও উঠে এসেছে তদন্তে।

এখানেই শেষ নয়। সালমা আক্তার কলেজের গাছ কেটে বিক্রি করে মোটা অঙ্কের অর্থ আয় করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার কলেজের পুকুর ছাত্রলীগ নেতাদের লিজ দিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের প্রমাণও মিলেছে। তার অনিয়মের তালিকা এতটাই দীর্ঘ যে, তদন্তকারীরা বিস্মিত হয়েছেন।

অভিযোগের সূত্রপাত ২০২২ সালে, যখন কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক ও ৩৪তম বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. আব্দুর রাজ্জাক শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাউশি মহাপরিচালকের কাছে ২৫টি লিখিত অভিযোগ জমা দেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তৎকালীন শিক্ষা সচিব ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তদন্তের নির্দেশ দেন। কিন্তু মাউশির পরিচালক অধ্যাপক শাহেদুল খবির চৌধুরী সেই তদন্ত স্থগিত করে রাখেন। একই বছর অভিযোগকারী আব্দুর রাজ্জাককে শিবির ক্যাডার আখ্যা দিয়ে বিভাগীয় মামলায় জড়ানো হয় এবং পরে তাকে রামগড় সরকারি কলেজে বদলি করা হয়। এতে বোঝা যায়, প্রভাবশালী মহলের চাপ ব্যবহার করে কীভাবে অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল।

অভিযোগকারীর বক্তব্যে উঠে এসেছে, তিনি প্রতিকার চেয়ে তৎকালীন সচিব সোলেমান খানের শরণাপন্ন হলেও সেখানে উল্টো চাকরি হারানোর হুমকি পান। পরবর্তীতে সরকার পরিবর্তনের পর সেই পুরনো তদন্তের নির্দেশ কার্যকর করা হলে অবশেষে সালমা আক্তারের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ প্রকাশ্যে আসে।

সালমা আক্তারের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা করা হলেও তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অতীতে যুগান্তর পত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে ভর্তি বাণিজ্য ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ বিস্তারিতভাবে উঠে আসে। “ভর্তি বাণিজ্যে বিপুল অর্থ আয় অধ্যক্ষের” শিরোনামে প্রকাশিত সেই প্রতিবেদন তখন ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।

এখন প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষা খাতের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় থেকে এত বড় আকারের দুর্নীতি কীভাবে সম্ভব হলো। সমাজে শিক্ষককে বলা হয় ‘মানুষ গড়ার কারিগর’। কিন্তু সেই অবস্থান থেকে নেমে এসে যদি একজন শিক্ষক কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিই কেঁপে ওঠে। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সালমা আক্তারের মতো অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম আরও বাড়বে।

নোয়াখালীর সাধারণ মানুষও এই ঘটনার বিচার দাবি করছেন। স্থানীয়রা বলছেন, কলেজটি অঞ্চলের প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যেখানে গড়ে ওঠার কথা, সেখানে দায়িত্বে থাকা অধ্যক্ষ যদি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন, তবে সেটি শুধু নৈতিক অবক্ষয়ই নয়, শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও বড় হুমকি।

এখন তদন্ত প্রতিবেদন হাতে আসার পর বিষয়টি আদালতে গড়ানোর সম্ভাবনা প্রবল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশি সূত্র জানিয়েছে, সরকার এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেবে। অবসরোত্তর ছুটিতে থাকা সালমা আক্তারের বিরুদ্ধে শিগগিরই প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই কেলেঙ্কারি কেবল একজন শিক্ষকের দুর্নীতির গল্প নয়, বরং এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। যখন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের তদবিরে একটি অভিযোগ বছরের পর বছর চাপা পড়ে থাকতে পারে, তখন তা পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

শিক্ষা খাতের সংস্কার ও দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগ নিয়ে নতুন সরকার ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। এই প্রেক্ষাপটে সালমা আক্তারের দুর্নীতির কাহিনি ন্যায়বিচারের পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। জনগণ অপেক্ষা করছে—এই কেলেঙ্কারির বিচার কি সত্যিই হবে, নাকি আবারও রাজনৈতিক প্রভাবের আড়ালে চাপা পড়ে যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত