১০০ সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবি নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৬৩ বার
১০০ সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবি নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চললেও বাস্তব চিত্র এখনও হতাশাজনক। জাতীয় সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্বকে সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে প্রতীকী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখার অভিযোগ রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত জুলাই সনদের খসড়ায় উল্লিখিত সংসদে সংরক্ষিত ১০০ আসনে সরাসরি ভোটের দাবি তুলেছে নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম। সংগঠনটি বলছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকেই এই ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে।

রোববার দুপুরে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানায় নারী অধিকার বিষয়ক ১২টি সংগঠনের এই জোট। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সুস্মিতা রায়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন মাহরুখ মহিউদ্দিন, অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, তাসলিমা আখতার লিমা, সাদাফ সায সিদ্দিকী এবং ড. ফারাহ কবির। তারা বলেন, নারীর প্রতিনিধিত্বকে প্রতীকী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না, বরং জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে তাদের সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

ফোরামের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, জুলাই সনদের খসড়ায় নারী রাজনৈতিক অধিকারকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করা হয়নি। জনগণের অর্ধেক নারী হওয়ার পরও তাদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। এ কারণে প্রস্তাবিত সনদ জনআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং গণতন্ত্রের পরিপন্থি। সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করার প্রস্তাব থাকলেও সরাসরি নির্বাচনের কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই, যা নারীর ক্ষমতায়নকে আরও দীর্ঘদিন প্রতীকী করে রাখবে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন থেকেই সংরক্ষিত আসনে সরাসরি ভোট কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলে নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে নিশ্চিত করতে হবে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে রাজনৈতিক দলগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে এবং তা ধাপে ধাপে ৫০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।

নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের নেত্রীরা বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যরা মূলত দলের মনোনয়ন ও নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। এতে তারা স্বাধীনভাবে নীতিনির্ধারণী কাজে ভূমিকা রাখতে পারেন না। সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নারীরা নির্বাচিত হলে তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন এবং তাদের কার্যক্রমে স্বাধীনতা ও জবাবদিহি তৈরি হবে।

একইসঙ্গে তারা নারী প্রার্থীদের জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের দাবি তোলেন। তাদের মতে, অর্থনৈতিক কারণে অনেক যোগ্য নারী রাজনীতিতে অংশ নিতে পারছেন না। নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা থাকলে নারীরা আরও সক্রিয়ভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন।

এই দাবির পক্ষে বিশেষজ্ঞরাও দীর্ঘদিন ধরে মত দিয়ে আসছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, নারী প্রতিনিধিত্ব প্রতীকী না রেখে বাস্তব ক্ষমতায় রূপান্তরিত করতে হলে সরাসরি নির্বাচনের বিকল্প নেই। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে, বিশেষত ভারতের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায়, সংরক্ষিত আসনে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত নারীরা নিজেদের এলাকায় উন্নয়ন ও প্রশাসনে দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছেন। রুয়ান্ডার সংসদে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্যও উদাহরণ হতে পারে।

নারী অধিকার ফোরামের নেত্রীরা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমরা চাই না নারীরা শুধু সংসদে উপস্থিত থাকুক, আমরা চাই তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকুক। জনগণের ভোটে নির্বাচিত না হলে প্রকৃত ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়।” তারা আরও বলেন, জুলাই সনদের চূড়ান্ত সংস্করণে নারীর জন্য প্রস্তাবিত দাবি অন্তর্ভুক্ত না হলে তা জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবে না এবং গণতন্ত্রকে আরও দুর্বল করে দেবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, দেশের সাধারণ মানুষও নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর পক্ষে। সংসদে সরাসরি নির্বাচিত নারী প্রতিনিধি থাকলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলো আরও কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হবে বলে জনমত রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনের শেষে ফোরামের নেত্রীরা আশা প্রকাশ করেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, রাজনৈতিক দল ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের দাবিগুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবে। তারা বলেন, “নারীর ক্ষমতায়নকে প্রতীকী পর্যায়ে আটকে রাখলে গণতন্ত্র কখনোই পূর্ণতা পাবে না। সময় এসেছে জনগণের অর্ধেকেরও বেশি নারীর প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার।”

নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের এই দাবি কেবল নারীর জন্য নয়, দেশের গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অগ্রগতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন দেখা বাকি, রাজনৈতিক দলগুলো এই দাবি কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে এবং জুলাই সনদের চূড়ান্ত খসড়ায় নারীর ক্ষমতায়নের সুস্পষ্ট রূপরেখা কতটা প্রতিফলিত হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত