প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ইউরোপের মঞ্চে রিয়াল মাদ্রিদের নামের পাশে সবসময়ই থাকে প্রত্যাশার চাপ। ১৫ বার চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা দলটি নতুন মৌসুমেও যাত্রা শুরু করল নাটকীয় এক জয় দিয়ে। অলিম্পিক মার্শেইয়ের বিপক্ষে মঙ্গলবার রাতে সান্তিয়াগো বের্নাবেউতে রিয়ালের শুরুটা একেবারেই ভালো ছিল না। প্রথম গোল হজম করে চাপের মুখে পড়লেও কিলিয়ান এমবাপ্পের জোড়া পেনাল্টিতে ২-১ ব্যবধানে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় তুলে নেয় জাবি আলোনসোর শিষ্যরা। লাল কার্ড দেখে ১০ জনে পরিণত হওয়ার পরও নিজেদের ইউরোপীয় মিশন শুভ সূচনায় শেষ করতে পেরেছে দলটি।
ম্যাচের প্রথম দিকেই দর্শকদের চমকে দেন অতিথি মার্শেইয়ের ফুটবলাররা। ম্যাচের নবম মিনিটে রিয়ালের তরুণ তারকা আর্দা গুলারের পায়ের কাছ থেকে বল কাড়েন ইংলিশ ফরোয়ার্ড মেসন গ্রিনউড। দ্রুতই তিনি বল বাড়ান টিমোথি উইয়াহর উদ্দেশে। উইয়াহ ঠান্ডা মাথায় বলটি নিয়ে রিয়ালের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক থিবো কোরতোয়ার পাশ দিয়ে জালে পাঠান। গোল উদযাপনে দারুণ উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন মার্শেই সমর্থকেরা, কারণ এটি ছিল উইয়াহর মার্শেই জার্সিতে প্রথম গোল। ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়েই যেন চমকে ওঠে রিয়াল মাদ্রিদ।
গোল হজমের পর থেকেই খেলা জমে ওঠে। রিয়ালের তারকাদের পায়ে আসে একের পর এক সুযোগ। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো গোয়েস ও এমবাপ্পে চেষ্টা চালালেও প্রথমার্ধে গোলের দেখা পায়নি স্বাগতিকরা। অবশেষে বিরতির ঠিক আগে নাটকীয় মোড় আসে। রদ্রিগো গোয়েস ডি-বক্সে ঢোকার সময় ফাউলের শিকার হন জিওফ্রে কন্দগবিয়ার ট্যাকলে। রেফারি বিন্দুমাত্র দেরি না করে পেনাল্টির বাঁশি বাজান। সেখান থেকে এমবাপ্পে গোল করে সমতা ফেরান। বের্নাবেউ গর্জে ওঠে তার নিখুঁত শটে।
দ্বিতীয়ার্ধেও পাল্টা আক্রমণ চালাতে থাকে দুই দল। মার্শেইয়ের পিয়েরে এমেরিক অবামেয়াং কয়েকটি সুযোগ নষ্ট করেন। তার এক শট অল্পের জন্য বাইরে যায়, অন্যটি দারুণ সেভ করে ফেরান কোরতোয়া। খেলায় উত্তেজনা বাড়তে থাকে, উভয় সমর্থকই হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন নির্ধারক মুহূর্তের।
সেই মুহূর্তই আসে ম্যাচের ৬৮ মিনিটে। রিয়ালের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার দানি কারভাহাল প্রতিপক্ষ গোলরক্ষক জেরোনিমো রুইয়ের সঙ্গে শারীরিক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে মাথা ঠেকিয়ে বসেন কারভাহাল, যা রেফারি সরাসরি লাল কার্ডে পরিণত করেন। রিয়াল নেমে যায় ১০ জনে। মাঠে তখন হতাশার সুর, কারণ ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ যেন হাতছাড়া হচ্ছিল মাদ্রিদের জন্য।
তবে ইউরোপীয় রাতের জন্য রিয়ালের আরেক নাম ‘নাটকীয় প্রত্যাবর্তন’। ১০ জনের দল নিয়েও আক্রমণ থামায়নি তারা। বরং ভিনিসিয়ুস জুনিয়র বক্সে প্রবেশ করলে ডিফেন্ডার ফাকুন্ডো মেদিনা হ্যান্ডবল করে বসেন। রেফারি ভিএআর দেখে দ্বিতীয়বারের মতো পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন। সেখান থেকে আবারও গোল করেন এমবাপ্পে। তার আত্মবিশ্বাসী শট জালে জড়াতেই বের্নাবেউ উল্লাসে ফেটে পড়ে। ২-১ গোলে এগিয়ে যায় রিয়াল, আর ম্যাচের ভাগ্যও নির্ধারিত হয়ে যায় অনেকটাই।
শেষ মুহূর্তে মার্শেই সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করলেও সমতায় ফেরাতে পারেনি। রিয়ালের গোলরক্ষক কোরতোয়া আরেকবার দলকে রক্ষা করেন অবামেয়াংয়ের শট ফিরিয়ে দিয়ে। শেষ বাঁশি বাজতেই রিয়াল মাদ্রিদ নিশ্চিত করে পূর্ণ তিন পয়েন্ট।
এই ম্যাচ ছিল কোচ জাবি আলোনসোর জন্যও এক বিশেষ উপলক্ষ। কিংবদন্তি মিডফিল্ডার হিসেবে খেলোয়াড়ি জীবনে ইউরোপ জয় করা আলোনসো এবার রিয়ালের কোচ হিসেবে প্রথমবার চ্যাম্পিয়নস লিগে মাঠে নামেন। তার শুরুর পরীক্ষা ছিল যথেষ্ট কঠিন, কারণ লাল কার্ড ও প্রতিপক্ষের দ্রুত গোলের পরও দলকে জয়ী করতে হয়। শেষ পর্যন্ত এমবাপ্পে ও পুরো দলের দৃঢ়তায় আলোনসোর অভিষেক রাত হয়ে উঠল স্মরণীয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই জয় রিয়াল মাদ্রিদের আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এমবাপ্পের আগমন নিয়ে গ্রীষ্মকালজুড়ে যে উত্তেজনা চলেছিল, তা মাঠে গিয়ে যেন নতুন মাত্রা পেল। রিয়ালের সমর্থকেরা দীর্ঘদিন ধরে আশা করছিলেন ফরাসি সুপারস্টারকে চ্যাম্পিয়নস লিগে দেখতে। তিনি যে পার্থক্য গড়ে দিতে সক্ষম, তা প্রমাণ করলেন প্রথম ম্যাচেই।
অন্যদিকে মার্শেইও লড়াই করেছে সম্মানের সঙ্গে। বিশেষ করে গ্রিনউড ও উইয়াহর সমন্বয়ে গড়া আক্রমণভাগ রিয়ালের রক্ষণকে একাধিকবার চাপে ফেলেছিল। অবামেয়াং কিছুটা দুর্ভাগ্যজনক হলেও তার অভিজ্ঞতা দলের জন্য কাজে এসেছে। তবে দিনের শেষে দুইটি পেনাল্টিই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
চ্যাম্পিয়নস লিগের প্রথম রাউন্ডেই নাটকীয় এমন ম্যাচ ইউরোপীয় ফুটবলের আকর্ষণকে আবারও মনে করিয়ে দিল। রিয়ালের জয় কেবল একটি ম্যাচ জয় নয়, বরং তাদের ‘অপরাজেয় চেতনার’ প্রতিফলন। বারবার চাপের মুখে পড়েও তারা যেভাবে ঘুরে দাঁড়ায়, সেটিই তাদের আলাদা করে রাখে অন্যদের থেকে।
সামনের ম্যাচগুলোতে অবশ্য রিয়ালকে আরও সতর্ক হতে হবে। রক্ষণভাগে কারভাহালের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের লাল কার্ড দলকে কঠিন চাপে ফেলেছিল। এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে হবে যদি তারা আবারও ইউরোপ জয় করতে চায়। তবে এমবাপ্পে-ভিনিসিয়ুস-রদ্রিগো ত্রয়ী যদি ছন্দ খুঁজে পান, তাহলে রিয়ালের স্বপ্নপূরণের পথে আর কোনো বাধাই বড় হয়ে উঠবে না।
সব মিলিয়ে সান্তিয়াগো বের্নাবেউতে গত রাতের ম্যাচ ছিল এক রোমাঞ্চকর নাটক। প্রথমে পিছিয়ে পড়া, এরপর সমতায় ফেরা, ১০ জনে নেমে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত জয়—প্রতি মুহূর্তেই দর্শকদের শ্বাসরুদ্ধ করে রেখেছিল। আর শেষে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাতে হলো এক নামকেই—কিলিয়ান এমবাপ্পে। তার জোড়া পেনাল্টিই বাঁচিয়ে দিল রিয়ালকে, আর নতুন মৌসুমের ইউরোপীয় অভিযানে এনে দিল এক রূপকথার সূচনা।