রংপুরে সাংবাদিক বাদলকে মারধর, গ্রেপ্তার ১

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৩৮ বার
রংপুরে সাংবাদিক বাদলকে মারধর, গ্রেপ্তার ১

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

রংপুরে সিনিয়র সাংবাদিক লিয়াকত আলী বাদলের ওপর সংঘটিত ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে রতন মিয়া নামের এক যুবককে। সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে দশটার দিকে রংপুর মহানগরীর শাপলা চত্বর হাজীপাড়া এলাকা থেকে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত রতন মিয়া নগরীর পূর্ব অভিরাম ডাক্তার পাড়ার বাসিন্দা এবং সাইফুল ইসলামের ছেলে। এ ঘটনায় পুরো রংপুর সাংবাদিক সমাজ ক্ষোভে ফেটে পড়েছে এবং ন্যায্য বিচারের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন সংবাদকর্মীরা।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রোববার (২১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নগরীর কাচারী বাজার এলাকায় একুশে টেলিভিশন ও দৈনিক সংবাদ-এর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক লিয়াকত আলী বাদলকে কথিত “জুলাইযোদ্ধা” পরিচয়ে একদল যুবক জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যায়। পরে তাকে রংপুর সিটি করপোরেশনের ভেতরে নিয়ে গিয়ে অমানুষিকভাবে মারধর করা হয়। হামলাকারীরা তাকে বাধ্য করার চেষ্টা করে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে প্রকাশিত সংবাদে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে। কিন্তু বাদল এতে সম্মত না হলে শারীরিকভাবে নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সাংবাদিকরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন।

তবে এখানেই ঘটনার ইতি ঘটেনি। বাদলকে উদ্ধারের পরপরই সিটি করপোরেশনের নতুন ভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট শেষে যখন সাংবাদিকরা সরে যাচ্ছিলেন, তখন আবারও কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে একটি মব তৈরি করে সাংবাদিকদের আটকে রাখে এবং হেনস্তা করে। এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই সাংবাদিক সমাজ আবারও প্রত্যক্ষ করেন গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন আঘাত।

এ ঘটনার পর সাংবাদিক বাদল রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ফাতেমা, ট্রেড লাইসেন্স শাখার প্রধান মিজানুর রহমান মিজু, সাবেক কাউন্সিলর লিটন পারভেজসহ মোট ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় রতন মিয়া পাঁচ নম্বর আসামি হিসেবে নাম আসে। সেই মামলার ভিত্তিতে পুলিশ সোমবার রাতে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ আতাউর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মামলা তদন্তের অংশ হিসেবে রতনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাকে আদালতে পাঠানো হবে। অন্যান্য আসামিদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক মহল ক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে। রংপুরসহ সমগ্র উত্তরাঞ্চলে সাংবাদিকরা মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি এবং প্রতিবাদ সভার মতো কর্মসূচি পালন করছেন। তারা একবাক্যে বলছেন, সাংবাদিকের ওপর হামলা মানে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা, আর গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ মানে গণতন্ত্রকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করার প্রচেষ্টা। সাংবাদিকদের দাবি, এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সকলকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হোক এবং কঠোর শাস্তি দেওয়া হোক।

এদিকে রংপুর সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধে সাংবাদিক সমাজের ক্ষোভও এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। অভিযোগ উঠেছে, সিটি করপোরেশনের ভেতর থেকে পরিকল্পিতভাবেই এই অপহরণ ও হামলার ঘটনা সংগঠিত হয়েছে। বাদলের প্রকাশিত প্রতিবেদনই মূলত এই ঘটনার সূত্রপাত বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর দৈনিক সংবাদে বাদলের লেখা একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় যার শিরোনাম ছিল—“রংপুরে জুলাইযোদ্ধার নামে অটোলাইসেন্স, পাঁচ কোটি টাকা বাণিজ্যের পাঁয়তারা”। প্রতিবেদনটিতে স্থানীয় অটোরিকশার লাইসেন্স প্রদানকে কেন্দ্র করে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘জুলাইযোদ্ধা’ নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে লাইসেন্স প্রদানের নামে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য চলছে এবং এর সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী মহল। ওই সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই বাদলকে হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছিল।

এ ঘটনায় সাংবাদিক মহল ছাড়াও সাধারণ মানুষও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংবাদিক নিরাপত্তার প্রশ্নে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং নাগরিক সমাজ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা মনে করছেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলার এই প্রবণতা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে আরও বাড়তে পারে।

ঢাকা থেকে জাতীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলোও এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল, পত্রিকা এবং অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোতে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হচ্ছে। সাংবাদিক ইউনিয়ন ও প্রেসক্লাব নেতারা বলেছেন, সাংবাদিকের ওপর হামলা হলে এর প্রতিক্রিয়া গোটা গণমাধ্যম জগতে পড়ে এবং সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তারা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এ ঘটনার বিচার দাবি করেছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এ ঘটনায় সক্রিয় রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, শুধু রতন মিয়াকেই নয়, মামলার অন্যান্য আসামিদেরও আইনের আওতায় আনার জন্য অভিযান চলছে। পাশাপাশি এ ঘটনার নেপথ্যে কারা প্রকৃতভাবে জড়িত, কারা পরিকল্পনাকারী, তাদেরও খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। পুলিশ বলছে, সাংবাদিক নিরাপত্তায় তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।

এদিকে আহত সাংবাদিক বাদল জানিয়েছেন, তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে চরমভাবে বিপর্যস্ত। হামলাকারীরা তাকে মৃত্যুর হুমকিও দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। তিনি বলেন, “আমি আমার পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছি মাত্র। জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আমি প্রতিবেদন করেছি। কিন্তু সেই প্রতিবেদনের কারণে আমাকে টার্গেট করে এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটানো হলো। আমি চাই এই ঘটনার বিচার হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো সাংবাদিক এভাবে নির্যাতনের শিকার না হয়।”

সাংবাদিক সমাজের অভিন্ন দাবি হলো—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের একটি মৌলিক স্তম্ভ, আর সেই স্বাধীনতাকে নিশ্চিহ্ন করার যেকোনো প্রচেষ্টা রোধ করতে হবে। তারা মনে করেন, একজন সাংবাদিকের ওপর হামলা কেবল ব্যক্তিগত আঘাত নয়, বরং গোটা সমাজের গণতান্ত্রিক চর্চার ওপর আঘাত। এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও প্রমাণ হলো, দুর্নীতি উন্মোচনে কাজ করা সাংবাদিকরা কীভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।

রংপুরের সাধারণ মানুষও এ ঘটনায় সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। শহরের বিভিন্ন এলাকায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তারা বলছেন, সাংবাদিকদের নির্যাতনের ঘটনা সমাজে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর ক্ষেত্র সংকুচিত করে দেয়।

সর্বোপরি, লিয়াকত আলী বাদলকে মারধর ও অপহরণের ঘটনায় গ্রেপ্তার রতন মিয়ার ঘটনা একটি দৃষ্টান্তমূলক পরিণতির সূচনা হতে পারে। যদি প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা যায়, তবে তা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করবে। অন্যদিকে, যদি ঘটনাটি ধামাচাপা পড়ে যায় বা দোষীদের শাস্তি না হয়, তবে সাংবাদিক সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি আরও গভীর হবে। এখন সবার নজর বিচার প্রক্রিয়ার দিকে। জনগণ ও সাংবাদিক মহল একবাক্যে বলছে—এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত