প্রকাশ ২৬ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের ভোজ্যতেল বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তিনদিনের ব্যবধানে সয়াবিন ও সুপার পাম তেলের দাম লিটারে প্রায় পাঁচ টাকা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বোতলজাত ও খোলা তেলের খুচরাবাজারেও প্রভাব পড়েছে। এ অবস্থার মধ্যে চাল, ডিম, মুরগি, মাছ এবং শাকসবজির দাম কিছুটা কমেছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
কারওয়ান বাজারের মায়ের দোয়া স্টোরের ব্যবসায়ী ইমামুদ্দিন বাবলু জানান, সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব সরকার প্রত্যাখ্যান করায় বাজারে নতুন অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, “তেলের দাম বৃদ্ধি হয়নি, তবে সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো কমিশন কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে বাজারে ভোক্তাদের বোতলজাত তেলের গায়ে দাম কার্যত চার থেকে পাঁচ টাকা বেড়েছে।” তার মতে, আগে যেখানে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ১৮৫ টাকায় বিক্রি হতো, এখন বোতলের গায়ের দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে, ফলে ব্যবসায়ীর লাভ নেই।
আরেক ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেন বলেন, “কোম্পানিগুলো ভোজ্যতেল নিয়ে নতুন করে নাটক শুরু করেছে। সরবরাহ কমিয়ে দেয়ার মাধ্যমে বাজারে তেলের সংকট তৈরি করা হচ্ছে। সমস্যাটি জটিল হওয়ার আগে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
সম্প্রতি বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে লিটারে ১০ টাকা দাম বাড়ানোর জন্য চিঠি পাঠায়। তবে ২২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাজারে দাম বৃদ্ধির কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তারপর থেকেই খোলা তেলের দাম বেড়ে গেছে। খুচরাপর্যায়ে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৭২ টাকায় এবং সুপার পাম অয়েলের দাম লিটার প্রতি ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকা। বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটার প্রতি ১৮৯ টাকায় স্থিত হয়েছে।
বাজার পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, পাইকারি পর্যায়ে খোলা তেলের দামও বেড়েছে। তিন-চার দিনের ব্যবধানে প্রতি ড্রাম (২০৪ লিটার) খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৩২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৩৪ হাজার ৪০০ টাকা, আর সুপার পাম তেলের দাম ২৯ হাজার থেকে বেড়ে ৩১ হাজার টাকা হয়েছে। বোতলজাত তেলের দাম খুচরায় না বাড়লেও পাইকারিতে প্রতি কার্টনে ৫০-৬০ টাকার মতো বেড়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা বিনা লাভে বিক্রি করছেন।
এদিকে অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম কিছুটা কমেছে। মোটা চালের দাম কেজিতে দুই থেকে চার টাকা কমেছে। জনতা রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী হাজী আবু ওসমান বলেন, “মোটা চালের দাম কমলেও মাঝারি ও সরু জাতের চাল আগের দামে বিক্রি হচ্ছে। মোটা স্বর্ণা গুটি ৫০-৫১ টাকা এবং পাইজাম ৫৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।” চাঁদপুর রাইস এজেন্সির মালিক বাচ্চু মিয়া জানান, “চালের দাম স্থিতিশীল থাকলেও মিনিকেট চালের দাম বস্তাপ্রতি ৫০ টাকা বেড়েছে।”
ডিমের দাম ডজন প্রতি ১০ টাকা কমে ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়, ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১০ টাকা কমে ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা এবং সোনালি কক মুরগির দাম ২৬০ থেকে ২৮০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। মাছ ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের জানান, “আগের সপ্তাহের তুলনায় মাছের দাম কিছুটা কমেছে। সব ধরনের মাছ কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে। মাসশেষে বাজার নরম হওয়ার কারণে আরও কমতে পারে।”
শাকসবজির বাজারও অস্থির। কাঁচামরিচের দাম প্রতি কেজি ১৫০-১৬০ থেকে কমে ১০০-১২০ টাকা, টমেটোর দাম ১০০ টাকা, করলা ৮০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৫০-৬০ টাকা, লম্বা বেগুন ৭০ টাকা, গোল বেগুন ১০০-১২০ টাকা, চিচিঙ্গা ৬০ টাকা, লাউ ৭০-৮০ টাকা এবং পেঁপে ২৫-৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁকরোল ৬০ টাকা, কচু ৪০-৫০ টাকা, শসা ৫০-৬০ টাকা এবং গাজর ৯০-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আলু ২০ টাকা কেজি এবং পেঁয়াজ ৭০-৮০ টাকায় বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
তবে কিছু খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লেও এটি সরবরাহ, চাহিদা ও মৌসুমের কারণে হয়েছে। ব্যবসায়ী ইমামুদ্দিন বাবলু জানান, “কিশমিশের দাম ২০০ টাকা বেড়ে ৮০০ টাকা, মসুর ডাল কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা এবং আলু বোখারা কেজিতে ১০০ টাকা বেড়ে ৫৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া সব ধরনের পোলাও চাল কেজিতে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের নীচু দামের দফা সাময়িক। এটি মূলত বাজারে সরবরাহের ঘাটতি, পাইকারি ও খুচরার দামের পার্থক্য, মৌসুমী প্রভাব এবং সরকারের নীতি কার্যকর না হওয়ার কারণে তৈরি হয়েছে। তাই ক্রেতা এবং ব্যবসায়ীদের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা অস্থিতিশীল।
সংক্ষেপে, দেশে খাদ্যপণ্যের বাজারে এই অস্থিরতা ভোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব বাজারের অন্যান্য পণ্যে পড়েছে। তবে চাল, ডিম, মুরগি, মাছ ও শাকসবজির দাম কিছুটা কমার ফলে কিছুটা স্বস্তি মিলছে। বাজারের অস্থিরতা মোকাবিলায় সরকারের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের সচেতনতা এবং বাজারে সতর্ক মনোভাবই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিকার। ভোজ্যতেল ও খাদ্যপণ্যের দাম ওঠানামা বাজারে সাময়িক হলেও, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সরকারকে কার্যকর নীতি ও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।