ইলিশ রক্ষায় ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর ইলিশ ধরা ও বিক্রি নিষিদ্ধ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৪৪ বার
ইলিশ রক্ষায় ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর ইলিশ ধরা ও বিক্রি নিষিদ্ধ

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশ সরকার মা ইলিশ মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে আগামী ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত বিশেষ অভিযান চালাবে। এ সময় ইলিশ মাছ ধরা, বিক্রি, পরিবহন বা মজুত করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ থাকবে। সোমবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, মা ইলিশ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে এই নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত জরুরি, যাতে ইলিশের প্রজনন মৌসুমে পরিপক্ক মাছ নিরাপদে ডিম দিতে পারে এবং প্রজাতি সুস্থভাবে বৃদ্ধি পায়।

উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, “দেশের তিন কোটি ২০ লাখ মানুষই ইলিশ মাছের সরাসরি বা পরোক্ষভাবে উপর নির্ভরশীল। মাছের সংরক্ষণ ও প্রজনন নিশ্চিত করা না হলে ভবিষ্যতে এই মাছের অভাব ও বাজারের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। তাই সরকারি উদ্যোগে এই বিশেষ অভিযান এবং নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হচ্ছে।”

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে দেশের ৩৭টি জেলার ১৬৫টি উপজেলার প্রায় ৬ লাখ ২০ হাজার জেলে পরিবারকে প্রতি পরিবারে ২৫ কেজি করে চাল সহায়তা হিসেবে দেওয়া হবে। এটি নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন এবং উপজেলা প্রশাসন পর্যায়ক্রমে পর্যবেক্ষণ এবং সরবরাহ কার্যক্রম পরিচালনা করবে। উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, “জেলে পরিবারের জীবিকা এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে সরকার যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করছে। তাদের খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে আমরা এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।”

সংবাদ সম্মেলনে দেশের ইলিশ প্রাপ্যতা, বাজারে মূল্য এবং সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। বলা হয়, গত ১৬ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে ইতিমধ্যেই প্রায় ৮১.৪৩৮ টন ইলিশ রপ্তানি হয়েছে। এছাড়া, দুর্গাপূজা উপলক্ষে আরও ১২০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে সরকার শর্ত দিয়েছে, রপ্তানিকৃত মাছ অবশ্যই মা ইলিশের সংরক্ষণ কার্যক্রমের বাইরে থাকা মাছ হতে হবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এই সময় সারা দেশে ইলিশ আহরণ, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রি এবং বিনিময় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে। তারা আশ্বস্ত করেছেন যে, সমস্ত জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়নের পর্যায়ে প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি চালাবে। কেউ নিয়ম ভঙ্গ করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান ২০২৫ মূলত ইলিশের প্রজনন মৌসুমকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে। দেশের প্রধান নদী ও খালগুলোতে পর্যবেক্ষণ, বালিশ ও নেট ব্যবহার করে ডিমে থাকা মাছ সুরক্ষিত রাখার জন্য বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। মৎস্য বিভাগ জানাচ্ছে, এই সময়ে নদী ও নদীর তীরে সতর্ক পলিসি মোতায়েন করা হবে যাতে কেউ নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করতে না পারে।

উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, “আমরা চাইছি, মা ইলিশ নিরাপদে প্রজনন করতে পারে। এ সময়ে যেকোনো ধরনের আহরণ বা বাজারজাতকরণ প্রজাতি হ্রাসের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই জেলেদের সহযোগিতা প্রয়োজন। আমরা চাই, তারা সরকারি নির্দেশনা মেনে চলুক। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন যথাযথ তদারকি করে।”

মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলিশ বাংলাদেশের নদী ও নদী তীরবর্তী মানুষের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। মা ইলিশ সংরক্ষণ ছাড়া এই গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি ভবিষ্যতে সংকটগ্রস্ত হতে পারে। তারা মনে করান, ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মাছের আহরণ বন্ধ করা হলে শুধু সংরক্ষণই হয় না, বরং দীর্ঘমেয়াদে জেলেদের আর্থিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়।

সরকারি পক্ষ আরও জানাচ্ছে, মা ইলিশ সংরক্ষণ ও আহরণ-নিষেধাজ্ঞা কার্যক্রমে জেলেদের সচেতনতার পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জেলেদের জীবনযাত্রা ও জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসন মাঠপর্যায়ে মনিটরিং করবে। পাশাপাশি, যেসব এলাকা থেকে ইলিশ সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেখানে পর্যাপ্ত মানবশক্তি ও সরঞ্জাম মোতায়েন করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে ফরিদা আখতার আরও বলেন, “ইলিশ ধরা, পরিবহন বা বিক্রির ওপর এই নিষেধাজ্ঞা কেবল সংরক্ষণের জন্য। এটি কোনোভাবেই জেলেদের দুঃখ বা ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে নয়। বরং, এটি আমাদের জাতীয় মাছের নিরাপত্তা ও দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ। এ সময়ে আমরা আশা করছি সকল জেলে পরিবার এবং সংশ্লিষ্টরা নির্দেশনা মেনে চলবেন।”

সরকারি উদ্যোগ অনুযায়ী, এই সময়ে ইলিশ সংরক্ষণে মৎস্যবিজ্ঞানীদের তদারকি, নদী পর্যবেক্ষণ, এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। যাতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ইলিশ আহরণ বা বাজারজাতকরণের মাধ্যমে আইন লঙ্ঘন করতে না পারে। পাশাপাশি, জাতীয় পর্যায়ে এই অভিযান ইলিশ প্রজাতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এবং ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে সহায়ক হবে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে, মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান ২০২৫ চলাকালীন সময়ের তথ্য ও পর্যবেক্ষণ রেকর্ড করা হবে। যা পরবর্তীতে নীতি নির্ধারণ ও সংরক্ষণমূলক কার্যক্রমে ব্যবহার করা হবে। মৎস্য বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, এই উদ্যোগের ফলে ইলিশের প্রজনন হারের বৃদ্ধি ঘটবে এবং দেশের নদী ও জলসম্পদে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।

এবারের মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান দেশের বৃহত্তম জেলেদের কল্যাণমূলক সহায়তা এবং জাতীয় মাছ সংরক্ষণের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনের তদারকি, স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ মিলিতভাবে এই অভিযানের সফলতা নিশ্চিত করবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার সংবাদ সম্মেলনের সমাপ্তিতে বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু মা ইলিশ সংরক্ষণ নয়, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য দেশের নদী ও মাছের প্রজাতি রক্ষা করা। জেলেদের জীবনমান বজায় রাখা এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এ উদ্যোগের অন্যতম মূল উদ্দেশ্য।”

এইভাবে, ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান কেবলমাত্র সময়মতো ইলিশ ধরা বন্ধ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দেশের জেলেদের সহায়তা, নদী ও মাছের প্রজাতি সংরক্ষণ, এবং দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় খাদ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি ব্যাপক উদ্যোগ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত