প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
গাজীপুরের শ্রীপুরে বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে সোমবার সকাল থেকে স্থানীয় শ্রমিকরা তিন ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। সড়ক অবরোধে উপজেলা শ্রীপুর-বরমী আঞ্চলিক সড়কে যান চলাচল স্থগিত হয়ে পড়ে। বিক্ষোভের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল বরমী সিটপাড়া এলাকায় অবস্থিত গার্ডেনিয়া ওয়্যার লিমিটেড কারখানা। প্রায় পাঁচ শতাধিক শ্রমিক সক্রিয়ভাবে বিক্ষোভে অংশ নেন।
শ্রমিকরা জানায়, আগস্ট মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়নি। গতকাল রোববার বেতন দেওয়ার কথা থাকলেও তা মেলেনি। ফলে শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে সোমবার সকালে কারখানার সামনে সমবেত হন এবং পরে সড়ক অবরোধে নেমে যান। তারা বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের দিকে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কয়েকজন শ্রমিক অভিযোগ করেন, কারখানা কর্তৃপক্ষ গোপনে প্রতিষ্ঠান বিক্রির চেষ্টা চালাচ্ছে এবং এ প্রক্রিয়ায় তাদের বেতন বাকি রেখে দিয়েছেন।
সুইং বিভাগের একজন অপারেটর, সাথি আক্তার বলেন, “গত আগস্টের বেতন না পাওয়ায় আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসের বেতনের বিষয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের বাধ্য হয়ে আন্দোলন করতে হয়েছে। আমরা চাই প্রশাসনিক পর্যায়ে হস্তক্ষেপ যেন বাস্তবায়ন হয়।”
অন্য শ্রমিক আলমগীর হোসেন জানান, “কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে আমাদের সংসার চলে। বেতন না পেলে আমরা ও আমাদের পরিবার কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা কারখানা কর্তৃপক্ষ বোঝে না।” শ্রমিকরা জানিয়েছেন, তাদের জীবিকায় এ ধরনের বিলম্ব মারাত্মক প্রভাব ফেলে এবং নিয়মিত বেতন না পেলে তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও পরিবার ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে।
প্রায় তিন ঘণ্টা চলা বিক্ষোভের পরে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যস্থতায় শ্রমিকরা কারখানা কর্তৃপক্ষের আশ্বাস পান যে, আগামীকাল মঙ্গলবারের মধ্যে বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হবে। এতে সন্তুষ্ট হয়ে শ্রমিকেরা বেলা ১১টার দিকে অবরোধ তুলে নেন। শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল বারিক সাংবাদিকদের জানান, শ্রমিকদের বোঝানো ও প্রশাসনিক উদ্যোগের ফলে অবরোধ শেষ হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, “কর্তৃপক্ষ আগামীকাল বকেয়া বেতন পরিশোধ করবে। এরপর নির্ধারিত সময়ে কারখানার কার্যক্রম পুনরায় শুরু হবে।”
এ প্রসঙ্গে কারখানা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কর্মকর্তারা ফোন ধরেননি। তবে শ্রমিকরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, আজকের হস্তক্ষেপ ও বিক্ষোভের ফলে তাদের বকেয়া বেতন দ্রুত পরিশোধ হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সমস্যা পুনরায় হবে না।
শ্রমিকদের দাবি ও বিক্ষোভের পেছনে মূল কারণ হলো ন্যায্য এবং সময়মতো পারিশ্রমিক না পাওয়া। শ্রমিকদের জীবিকা, পরিবার ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে বেতন অপরিহার্য। বিশেষত কারখানার মতো শিল্পক্ষেত্রে, যেখানে শত শত মানুষ রোজগারের জন্য নির্ভরশীল, সেখানে বেতন পরিশোধে বিলম্ব শ্রমিকদের জীবনযাত্রাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। শ্রীপুরের শ্রমিকরা এই অনিশ্চয়তার প্রতিবাদ জানাতে সামাজিক ও প্রশাসনিক মাধ্যম ব্যবহার করেছেন, যার মধ্যে সড়ক অবরোধ এক প্রাধান্যপূর্ন প্রতিবাদমূলক ব্যবস্থা ছিল।
শ্রমিকরা বলেন, “আমাদের ক্ষোভ কেবল পারিশ্রমিক বাকি থাকার কারণে নয়, বরং কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে দেরির কারণে। আমরা চাই এই ধরনের অনিশ্চয়তা আর হোক না।” তারা আশা প্রকাশ করেছেন, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার জন্য প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি কার্যকর হবে।
গাজীপুরে এই ধরনের বকেয়া বেতনের সমস্যার পুনরাবৃত্তি শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করছে। শ্রমিকদের দাবির প্রতি সাড়া না দিলে ভবিষ্যতে বৃহত্তর আন্দোলনের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের এবং শিল্পক্ষেত্রের কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
শ্রীপুরের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শ্রমিকরা জানিয়েছেন, তারা সরাসরি আন্দোলনের মাধ্যমে যে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন তা এখনকার বাস্তব। বেতন বাকি থাকলে শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা বিপন্ন হয়। শিক্ষা, চিকিৎসা, খাবার ও পরিবার পরিচালনার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়। তারা আশা করছেন, আগামীকাল বকেয়া বেতন পরিশোধের আশ্বাস বাস্তবায়ন হবে এবং তাদের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হবে।
এই ঘটনার মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির গুরুত্ব পুনরায় প্রমাণিত হলো। শিল্পক্ষেত্রের সুস্থ ও নিয়মিত পরিচালনার জন্য শ্রমিকদের বেতন সময়মতো পরিশোধ করা অপরিহার্য। প্রশাসনের তৎপরতা এবং শ্রমিকদের প্রতিবাদ উভয়ই নিশ্চিত করবে যে শিল্পক্ষেত্রে মানবিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় থাকবে।
শ্রীপুরের গার্ডেনিয়া ওয়্যার লিমিটেডে শ্রমিকদের এই সড়ক অবরোধ আন্দোলন প্রমাণ করে যে, সময়মতো বেতন না পাওয়ার বিষয়টি শুধুমাত্র আর্থিক নয়, বরং সামাজিক ও মানবিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শ্রমিকরা এখন নিশ্চিত করতে চাই, ভবিষ্যতে তাদের বেতন ও অন্যান্য অধিকার সংরক্ষিত থাকবে এবং শিল্পক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা কার্যকর হবে।
শ্রমিকদের আশ্বাস এবং প্রশাসনের মধ্যস্থতায় সমস্যা সমাধানের এই উদ্যোগ স্থানীয় শ্রমিক সমাজে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়েছে। তবে কারখানা কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এবং প্রাথমিক পদক্ষেপে বিলম্বের কারণে শ্রমিকদের মধ্যে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। আগামীকাল বকেয়া বেতন পরিশোধ কার্যক্রম সম্পন্ন হলে শ্রীপুরের শ্রমিকরা পুনরায় স্বাভাবিক কর্মসংস্থানে ফিরে যাবেন এবং সড়ক ও জনপরিবহন স্বাভাবিক হবে।
সড়ক অবরোধ আন্দোলন শেষ হলেও শ্রমিকরা সতর্ক। তাদের মনে রয়েছে, ন্যায্য বেতন পরিশোধ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে কঠোর আন্দোলনের আশঙ্কা থেকে যায়। তাই শ্রমিকরা আশা করছেন, কারখানা কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসন এখন থেকে নিয়মিত বেতন নিশ্চিত করবে, যা শ্রমিক সমাজে স্থায়ী শান্তি এবং সুস্থ কর্মপরিবেশ বজায় রাখবে।
গাজীপুরের এই ঘটনা দেশের শ্রমিক সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে যে, সময়মতো বেতন প্রদান না হলে শ্রমিকরা সরাসরি প্রতিবাদে নামবেন। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক, মানবিক এবং নৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিক অধিকার ও শিল্পক্ষেত্রে সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের তৎপরতা এবং শিল্পনেতাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।