প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
কলকাতায় আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশের সাবেক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের বিস্তারিত তথ্য ভারতের ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি) হাতে পেয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ আগস্ট পর্যন্ত কলকাতায় অবস্থানকারী মোট ৭৩৪ জনের তথ্য সংরক্ষিত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে পুলিশ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাবেক সচিব এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে থাকা ব্যক্তিরা। ভারত এই ডেটাবেস তৈরি করেছে, যাতে তাদের চলাফেরা, অবস্থান ও যোগাযোগের সমস্ত তথ্য নিশ্চিত করা যায়।
এই তালিকায় বাংলাদেশের সাবেক প্রধান সচিব ও নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা কর্মকর্তা মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি পূর্বে প্রধানমন্ত্রীর পিএস-১ এবং মুখ্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। চব্বিশের ডামি ভোটের আগে বিশেষ দায়িত্ব পালন করার পুরষ্কার হিসেবে তার চুক্তির মেয়াদ এক বছর বৃদ্ধি পেয়েছিল। তাছাড়া কোটা সংস্কার আন্দোলন ও শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়ন ও হত্যাকাণ্ডে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকার অভিযোগ রয়েছে। সরকার তাঁর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করেছে। বর্তমান অবস্থানে কলকাতায় তিনি অবস্থান করছেন।
সাবেক সচিব মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনও কলকাতায় অবস্থান করছেন। প্রধানমন্ত্রীর এপিএস-১ এবং ঢাকার ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, ৫ আগস্টের পর পাল্টা ক্যু চালানোর উদ্দেশ্যে তিনি গোপন বৈঠক করেছিলেন। সরকারি সূত্র বলছে, সুবিধা করতে না পারায় তিনি ভারতে পালিয়ে গেছেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর মোশাররফ হোসেন কাজলেরও কলকাতায় অবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে। কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি এবং অর্থপাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত এই সরকারি আইনজীবী বর্তমানে কলকাতার অভিজাত সল্ট লেক এলাকায় অবস্থান করছেন।
পুলিশের মধ্যে কলকাতায় অবস্থানকারী উল্লেখযোগ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, যিনি জুলাই গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত। তার সঙ্গে স্ত্রী এবং ছেলে রয়েছেন। হাবিবুর রহমান বর্তমানে ভারতের ডিপ স্টেটের সঙ্গে মিলে বিভিন্ন বাংলাদেশবিরোধী কার্যক্রমে লিপ্ত রয়েছেন। এছাড়া সাবেক কমিশনার কৃষ্ণপদ রায়, ডিআইজি মো: আনিসুর রহমান, ডিআইজি মনিরুজ্জামান, প্রলয় কুমার জোয়ার্দার, সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রিফাত রহমান শামীম কলকাতায় অবস্থান করছেন।
এসপি ও অতিরিক্ত এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তা, যাদের মধ্যে আছেন আসাদুজ্জামান, গোলাম মোস্তফা রাসেল, মো: শাহজাহান, আরিফুর রহমান মন্ডল, মুহম্মদ সানোয়ার হোসেন, হাসান আরাফাত, মো: মাসুদুর রহমান, এস এম শামীম, শাহনূর আলম পাটোয়ারী, হাসানুজ্জামান মোল্লা, শাহ আলম মো. আক্তারুল, রাজন কুমার দাস, মো: রাশেদুল ইসলাম এবং এডিসি ইফতেখারুল ইসলাম, তারা সবাই ভারতে পালিয়ে রয়েছেন।
সদর পুলিশ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি পুলিশের পরিদর্শক ও উপ-পরিদর্শক পদমর্যাদার ব্যক্তিরাও কোলকাতায় আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের মধ্যে জাকির হোসেন, মো. ওবায়দুল হক মামুন, কাজী মঈনুল ইসলাম, অপূর্ব হাসান, মোহাম্মদ মহসিন, শামসুল হক, তানভীর আহমেদ, আশীষ কুমার দেব এবং মো. মশিউর রহমান রয়েছেন। উপ-পরিদর্শকরা যেমন তরিকুল ইসলাম ভূইয়া, মোহাম্মদ সোহেল ও শেখ মো: জাবেদ মিয়া দেশ ছেড়ে কলকাতায় অবস্থান করছেন।
এ ছাড়া স্থানীয় রাজনীতিক ও স্থানীয় প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও কলকাতায় অবস্থান করছেন। বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র আবুল খায়ের আবদুল্লাহ এবং ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনও বর্তমানে কলকাতায় অবস্থান করছেন।
ভারতীয় আইবি এই ডেটাবেসের মাধ্যমে পালিয়ে থাকা বাংলাদেশের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাদের স্থিতি, যোগাযোগ এবং চলাচল সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের বেশিরভাগকে বাংলাদেশের সরকার সাময়িক বরখাস্ত করেছে। কৃষ্ণপদসহ কয়েকজনকে ৫ আগস্টের পরে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
ডেটাবেসে থাকা তথ্য অনুসারে, সাবেক নির্বাচন কমিশনার আনিসুর রহমানও কলকাতায় আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি তার স্ত্রী সালমা সুলতানাকে নিয়ে কলকাতার অ্যাপার্টমেন্ট ১০২, গুলমহর, ৬০ মিডল্টন স্ট্রিট, কানকারিয়া এস্টেটে বসবাস করছেন।
ভারতের এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ৭৩৪ জনের তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ করে ভারতের পক্ষ এই ব্যক্তিদের অবস্থান, কার্যক্রম ও যোগাযোগের দিকগুলো মনিটর করছে।
এই তালিকায় সংরক্ষিত তথ্যের মধ্যে প্রত্যেকের নাম, বর্তমান ঠিকানা, বাংলাদেশি পাসপোর্ট নম্বর এবং যোগাযোগ নম্বর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এতে শুধু পুলিশ বা প্রশাসনিক কর্মকর্তারাই নয়, রাজনৈতিক নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত।
সরকারি সূত্র জানায়, কলকাতায় আশ্রয় নেওয়া এই ব্যক্তিদের বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে এখন ভারতের কাছে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়ায়, বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে।
এই ডেটাবেসে থাকা তথ্যের মাধ্যমে ভারত এবং বাংলাদেশ উভয় দেশের গোয়েন্দা সংস্থা পালিয়ে থাকা শীর্ষ কর্মকর্তা ও পুলিশের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে, যারা সরকারের পতনের জন্য ষড়যন্ত্রে জড়িত বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত তাদের দৃষ্টিকোণ বিশেষ নজরে রাখা হচ্ছে।
তথ্য সূত্রের মাধ্যমে জানা যায়, কলকাতায় আশ্রয় নেওয়া এই ব্যক্তিরা বিভিন্ন ধরণের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত এবং সেখানে বসে বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছেন। বিশেষত পুলিশ ও প্রশাসনের শীর্ষ পদে থাকা কর্মকর্তা ও সাবেক সচিবরা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ রাখছেন।
ভারতের এই তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ কৌশলটি বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থা ও গোয়েন্দা তত্ত্বাবধানকে শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক আইন ও সীমান্ত নিরাপত্তার পরিপ্রেক্ষিতে এই ব্যক্তিদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ সহজ হবে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কলকাতায় অবস্থানরত এই কর্মকর্তাদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি তাদের কার্যক্রম সীমিত করার চেষ্টা চলবে। এই বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কলকাতায় আশ্রয় নেওয়া এই ৭৩৪ জনের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে পুলিশ ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা থাকার কারণে, ভারতের আইবি নিয়মিত তাদের মোবাইল নম্বর, পাসপোর্ট তথ্য এবং ঠিকানা যাচাই করে চলেছে। এছাড়া, তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
এই ডেটাবেসের মাধ্যমে শুধু ব্যক্তিগত তথ্য নয়, তাদের কার্যক্রম, সম্ভাব্য নাশকতা বা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টাও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থা আশা করছে, ভবিষ্যতে এই তথ্য ব্যবহার করে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সংক্ষেপে, কলকাতায় আশ্রয় নেওয়া এই সাবেক কর্মকর্তা ও পুলিশদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা উদ্যোগ। এতে বাংলাদেশের সরকারের পাশাপাশি ভারতও তাদের কার্যক্রম মনিটর করতে পারছে, যা দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন দিক উন্মোচন করবে।