জুলাই গণঅভ্যুত্থান: হত্যাযজ্ঞ ও গুমের নতুন তথ্য ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৫ বার
শেখ হাসিনার রায় নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যা চলছে

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

জুলাই মাসে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের সময় হত্যাকাণ্ড, গুম এবং নৃশংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নতুন তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর জানান, হত্যাযজ্ঞ বন্ধে আসামিরা কোনো পদক্ষেপ নেননি। তিনি বলেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ গত ১৫ বছরে খুন, গুম ও নির্যাতনের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চেয়েছিলেন শেখ হাসিনা।”

আদালত থেকে প্রশ্ন করা হয়, জুলাই মাসে যখন হত্যাকাণ্ড ও নৃশংসতা চলছিল, আসামিরা কি কোনো পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর বলেন, তদন্তে এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি। বরং যারা হত্যাকাণ্ড, গুম বা জখমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

মঙ্গলবার আদালতে আলমগীর দুটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনও উপস্থাপন করেন। বিবিসি ও আলজাজিরার প্রতিবেদনে জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশের হত্যাযজ্ঞ ও নির্দেশনার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫ আগস্ট রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন মিরাজ নামের এক শিক্ষার্থী। মিরাজের ভাই পাভেলকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় গণভবনে জরুরি বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় ৫ আগস্ট গণভবন ঘেরাও কর্মসূচি সফল না করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। বৈঠকে শেখ হাসিনার নির্দেশনা ছিল, আন্দোলনকারীরা যেন ঢাকায় প্রবেশ করতে না পারে। এরপর রাজধানীতে সব প্রবেশমুখে পুলিশের ব্যারিকেড বসানো হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ৫ আগস্ট সকালে হাজারো ছাত্র ও জনতা ঢাকার দিকে রওনা দেন। মিরাজ ও তার বন্ধু শাওন আল মাহমুদও সেই দলে ছিলেন। দুপুর ১টা ২৬ মিনিটে যাত্রাবাড়ী টোলপ্লাজায় আন্দোলনকারীরা যখন ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করে, তখন পুলিশ থানার ভেতর থেকে বের হয়ে গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে মিরাজ নিহত হন।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) তৎকালীন মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান একটি বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের অবস্থান শনাক্ত করতেন। এরপর তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হতো। তদন্তে উঠে এসেছে, শেখ হাসিনার আমলে গুম হওয়া বেশিরভাগ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। নিহতদের মরদেহ সিমেন্টের ব্যাগে বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।

আলজাজিরার প্রতিবেদনে শেখ হাসিনা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নুর তাপসের কথোপকথনও প্রকাশিত হয়। সেখানে শেখ হাসিনা আন্দোলন দমন করার জন্য প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করার নির্দেশ দেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, হত্যাযজ্ঞের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনার প্রমাণ রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও উঠে আসে ১৯ জুলাই সেনাবাহিনী মাঠে নামানোর বিষয়। একই সময়ে রংপুরে শহীদ আবু সাঈদের পরিবারকে গণভবনে ডেকে ভুল বোঝানো হয়েছিল। নিহতের বোন সাক্ষাৎকারে বলেন, তাদের হাতে কিছু সঞ্চয়পত্র দেওয়া হয় যেন মনে হয় বিষয়টি মীমাংসা হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে হত্যাকারীদের চেহারা ভিডিওতে স্পষ্ট থাকার পরও তদন্তে কোনও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে শহীদ মাহামুদুর রহমানের বোন সাবরিনা আফরোজ সেবন্তীর সাক্ষাৎকারও আলজাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তিনি বলেন, ১৯ জুলাই বিকেলে পুলিশ খুব কাছ থেকে গুলি করে তার ভাইকে হত্যা করে। পরে শেখ হাসিনা তাকে গণভবনে ডেকে ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দেন। তিনি এই প্রস্তাবে রাজি হননি। এছাড়া আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী নাফিসা হোসেন মারওয়ার বাবা আবুল হোসেনের সাক্ষাৎকারও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়। তিনি জানান, ৫ আগস্ট তার মেয়েকে হত্যা করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তার বিবরণে জানা যায়, জুলাই আন্দোলনের সময়কার নৃশংসতার বিরুদ্ধে কোনও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। হত্যাযজ্ঞ ও গুমের ঘটনায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণগুলো স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে, হত্যাকাণ্ডে সরকারী ভূমিকা এবং উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনার প্রমাণ রয়েছে।

ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরা এই তথ্য-প্রমাণ দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায়কে সামনে এনেছে। হত্যা, গুম ও নির্যাতনের বিষয়ে তদন্তকারীর বক্তব্য এবং আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলো স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, জুলাই আন্দোলনের সময় নিহত ও আহত শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার সহায়তায় হত্যা করা হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের হত্যাযজ্ঞ ও গুমের ঘটনা শুধুমাত্র আন্দোলন দমনই নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে। আদালত এই প্রমাণ ও সাক্ষ্য-সাক্ষীর ভিত্তিতে কিভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, তা দেশের রাজনৈতিক ও আইনি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে ধরা হবে।

আদালতে উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণ ও সাক্ষ্যগুলো আন্তর্জাতিক নজর কাড়ছে। তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর জানান, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ বিচার নিশ্চিত করার জন্য ট্রাইব্যুনাল সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। হত্যাযজ্ঞ ও গুমের ঘটনায় রাষ্ট্রীয় অংশগ্রহণের প্রমাণ পাওয়ায় বিচার প্রক্রিয়া আরও জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ট্রাইব্যুনালের এই শুনানি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জুলাই আন্দোলন ও তৎকালীন সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে নতুন আলোকপাত করেছে। হত্যাযজ্ঞ ও গুমের ঘটনায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায় এবং রাষ্ট্রীয় ভূমিকার প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন হওয়ায় এই মামলা আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হচ্ছে। আগামী দিনে আদালতের রায় দেশের ন্যায়বিচার প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত