রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারের ভিতরেই সমাধানযোগ্য: ইউএনএইচসিআর প্রধান গ্রান্ডি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৩ বার
রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারের ভিতরেই সমাধানযোগ্য: ইউএনএইচসিআর প্রধান গ্রান্ডি

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, ঢাকা ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি মঙ্গলবার সংযুক্ত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ‘মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে মন্তব্য করেন, যে রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং তাই স্থায়ী সমাধানও সেই দেশের ভেতরেই সম্ভব। তিনি সতর্ক করে বলেন, মিয়ানমারের পক্ষ থেকে সাহসী ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া রোহিঙ্গাদের দুর্দশা থামবে না।

গ্রান্ডি স্মরণ করান যে, আট বছর আগে মিয়ানমারের সেনাদের সহিংসতার কারণে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। অনেকে তখনই রাখাইন রাজ্যেই বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রাখা হয়েছিল। তিনি উল্লেখ করেন, যদিও রাখাইনে বর্তমানে আরাকান আর্মির কিছু অঞ্চল দখলে আছে, তবুও রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রার মানে কোনও পরিবর্তন হয়নি। তাদের উপর গ্রেপ্তার-আটক হওয়ার ভীতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় সীমাবদ্ধতা, চলাচলে নিষেধাজ্ঞা এবং জোরপূর্বক শ্রম এখনো চলছে। প্রতিদিনই রোহিঙ্গারা বর্ণবাদী আচরণ এবং আতঙ্কের শিকার হচ্ছেন।

বাংলাদেশের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে গ্রান্ডি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং ২০২৪ সালে নতুন সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা দেশটিতে আশ্রয় পেয়েছে। তিনি বলেন, “অসংখ্য চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্বের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।” তিনি বাংলাদেশের সহায়তার মান এবং দেশের মানবিক দায়িত্ববোধের প্রশংসা করেন, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি অনন্য উদাহরণ।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যদিও বৈশ্বিক সংস্থাগুলো অর্থায়ন করছে, তবু বাংলাদেশে মানবিক সহায়তা তহবিলে ঘাটতি এখনও রয়েছে। বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ১.২৫ বিলিয়ন ডলারের তহবিল সত্ত্বেও পর্যাপ্ত তহবিল না পেলে জরুরি সহায়তা কাটছাঁট করতে হবে। এতে শিশুদের অপুষ্টি বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা ব্যাহত হওয়া, এবং রোহিঙ্গাদের বিপজ্জনক নৌযাত্রায় আহত বা প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গ্রান্ডি বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের কাছে তহবিল বৃদ্ধির পাশাপাশি পুনর্বাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধির আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কেবল মানবিক সহায়তায় রোহিঙ্গা সংকট সমাধান হবে না। “আমরা উদাসীনতার পথে চলতে পারি না। একটি জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস হতে দিয়ে সমাধান আশা করা যায় না।” তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী সমাধান আনতে হলে মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষকে সাহসী ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

গ্রান্ডি রাখাইন উপদেষ্টা কমিশনের সুপারিশগুলিকে এখনও প্রাসঙ্গিক ও পথপ্রদর্শক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যদি মিয়ানমার সরকার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ এবং টেকসই প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে। তিনি প্রভাবশালী দেশগুলোকে মিয়ানমার ও আরাকান আর্মির সঙ্গে সক্রিয় সম্পর্ক বৃদ্ধির আহ্বান জানান, যাতে মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা যায় এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়সঙ্গত সমাধান আনা সম্ভব হয়।

গ্রান্ডি বলেন, রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি প্রায়ই আন্তর্জাতিক মনোযোগের বাইরে থাকে। রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা এবং বিদ্যমান জঙ্গি গ্রুপের প্রভাব এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু তহবিল বা আন্তর্জাতিক সহায়তা দেওয়া যথেষ্ট নয়; মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা দরকার।

তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের পুনর্বাসন শুধু বাংলাদেশ বা আশেপাশের দেশগুলোর দায়িত্ব নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। স্থানীয় জনগণ, স্থানীয় প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলোকে এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।

গ্রান্ডি বলেন, “রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান কেবল তখনই সম্ভব যখন তাদের অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া তাদের স্বচ্ছন্দ জীবন, জীবিকা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।” তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি অনুরোধ জানান, তহবিলের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় ব্যবস্থাপনার সমর্থন প্রদান করতে হবে।

গ্রান্ডি উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক সহায়তা নয়, বরং মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উদ্যোগের ওপর নির্ভর করে। তিনি বলেন, “যদি মিয়ানমার সরকার স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপদ ও উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তায় এটি সম্ভব। তবে এর জন্য মিয়ানমারের কাছ থেকে সাহসী এবং দৃঢ় রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রয়োজন।”

তিনি আরও জানান, রাখাইন উপদেষ্টা কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে ন্যায়সঙ্গত সমাধান ও রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। গ্রান্ডি সতর্ক করে বলেন, রোহিঙ্গাদের উপর অব্যাহত বৈষম্য, চলাচলে বাধা, শিক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং স্বাস্থ্যসেবার অভাবের কারণে এই জনগোষ্ঠী এখনও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তিনি বলেছিলেন, “মানবিক সহায়তা যতই দেওয়া হোক, যদি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা কার্যকর না হয়, তবে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।”

সর্বশেষ গ্রান্ডি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পুনর্বাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “রোহিঙ্গাদের দুর্দশা সমাধান করতে হলে শুধু মানবিক সহায়তা নয়, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সহায়তাও অপরিহার্য। এজন্য মিয়ানমারের সঙ্গে সক্রিয় সহযোগিতা অপরিহার্য।”

এই আলোচনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভিন্ন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। তারা রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, স্থায়ী সমাধানের জন্য রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা এবং মিয়ানমারের সরকারের সঙ্গে সক্রিয় সম্পর্ক বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। গ্রান্ডির বক্তব্যে উঠে আসে যে, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কেবল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাহায্যে নয়, বরং মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপের ওপরও নির্ভর করছে।

মোটকথা, ফিলিপ্পো গ্রান্ডির বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি যেখানে, স্থায়ী সমাধানও সেখানে সম্ভব। মানবিক সহায়তা জরুরি হলেও, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য মিয়ানমারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর পদক্ষেপ অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন ও তহবিলের সঙ্গে মিলিয়ে যদি মিয়ানমার অভ্যন্তরীণভাবে উদ্যোগী হয়, তবে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ, স্বচ্ছন্দ এবং টেকসই জীবন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত