মার্কিন শাটডাউন: ডলারের দর ২২ বছরে সর্বোচ্চ বার্ষিক পতনের পথে

নিজস্ব সংবাদদাতা
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪২ বার
নভেম্বরের ১৬ দিনে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৩৫ শতাংশের বেশি

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ‘২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার (শাটডাউন) প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসে অস্থায়ী বাজেট নিয়ে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় দেশটির সরকার কার্যত আর্থিক অচলাবস্থায় পড়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে মার্কিন ডলারের বাজারে। বুধবার (১ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে ডলারের দর ০.২৭ শতাংশের বেশি কমে দাঁড়ায় ৯৭.১৯-এ। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডলার প্রায় ১০ শতাংশ দর হারিয়েছে, যা ২২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বার্ষিক দরপতনের পথে নিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী মুদ্রাটিকে। খবর প্রকাশ করেছে আনাদোলু এজেন্সি।

ডলারের মান নির্ধারণ করা হয় ইউরো, জাপানি ইয়েন, ব্রিটিশ পাউন্ড, সুইস ফ্রাঁক, কানাডিয়ান ডলার এবং সুইডিশ ক্রোনাসহ ছয়টি প্রধান মুদ্রার বিপরীতে। এই সূচকই আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের শক্তি বা দুর্বলতা নির্দেশ করে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মার্কিন শাটডাউনের কারণে সরকারি সংস্থাগুলো থেকে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশ বিলম্বিত হবে। শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো ইতিমধ্যে জানিয়েছে, শাটডাউনের সময় কৃষি বহির্ভূত চাকরি, বেকার ভাতা আবেদন এবং মুদ্রাস্ফীতি সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশ সম্ভব হবে না। এই তথ্যগুলো ছাড়া বাজার সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে না পারায় বিনিয়োগকারীরা আরও অনিশ্চয়তায় পড়ছেন।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে সরকারি কার্যক্রমের এমন অচলাবস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে আস্থার সংকট তৈরি করে। ডলারের পতন কেবল আমেরিকার জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ডলারের সঙ্গে যুক্ত। ডলারের দর কমলে কিছু দেশ যেমন সুবিধা পায়, আবার অনেক দেশ বিপাকে পড়ে যায়।

মার্কিন শাটডাউন মানে হলো কংগ্রেসে বাজেট নিয়ে সমঝোতা না হওয়া এবং ফলে সরকারি কার্যক্রমের একটি বড় অংশ বন্ধ হয়ে যাওয়া। এতে বহু সরকারি কর্মচারী বাধ্য হয়ে বিনা বেতনে কাজ করতে হয় বা নতুন বাজেট পাস না হওয়া পর্যন্ত বাধ্যতামূলক ছুটিতে যেতে হয়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকারি সেবার ওপর নির্ভরশীল ব্যবসা-বাণিজ্যও এই অচলাবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, যদিও শাটডাউন সরাসরি বড় কোনো অর্থনৈতিক মন্দা ডেকে আনে না, তবে এটি দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করে। সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ভিসা ও পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকরণ—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই মুহূর্তে মার্কিন ডলারের দুর্বলতা ইউরো এবং ইয়েনকে শক্তিশালী করে তুলছে। বিশেষ করে ইউরোজোনের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ইউরোকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। আবার জাপানি ইয়েনকেও তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বিনিয়োগ মুদ্রা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর ফলে বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে এক ধরনের পুনঃবিন্যাস ঘটছে, যেখানে ডলারের প্রভাব খানিকটা হলেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

এদিকে রপ্তানি ও আমদানি নির্ভর দেশগুলোতে ডলারের পতনের প্রভাব ভিন্নরকম হতে পারে। যেমন—ডলার দুর্বল হলে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলকভাবে কমে যায়, ফলে আমেরিকান পণ্যের প্রতিযোগিতা বাড়ে। কিন্তু আমদানি খাতে খরচ বেড়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ, ভারত কিংবা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ যেগুলো আমদানিনির্ভর, তাদের ক্ষেত্রে ডলারের মান কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে ওঠানামা হতে পারে। তবে অন্যদিকে রপ্তানি আয়ে কিছুটা সুবিধাও পাওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ডলারের দরপতন বাংলাদেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পে কিছুটা বাড়তি সুযোগ তৈরি করতে পারে। কারণ ডলারের মান কমে গেলে ইউরোপ ও জাপানসহ অন্যান্য বাজারে রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। তবে আমদানি নির্ভর খাত—যেমন জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল ও খাদ্যপণ্য—এসব ক্ষেত্রে মূল্য ওঠানামার প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে। এছাড়া বৈদেশিক ঋণ শোধের ক্ষেত্রেও মুদ্রার এই অস্থিরতা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

শাটডাউনের কারণে মার্কিন অর্থনীতির ভেতরে যে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে, সেটি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও দুর্বল করছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি দ্রুত বাজেট নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারে, তবে ডলারের মান আরও পতনের দিকে যাবে। এর ফলে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে পুঁজির প্রবাহ হঠাৎ করে পরিবর্তিত হতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে।

ইতিহাস বলছে, এর আগেও যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার শাটডাউনের মুখোমুখি হয়েছে। তবে প্রতিবারই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আর্থিক বাজার ও সরকারি সেবায়। ২০১৮ সালে শাটডাউনের সময় মার্কিন শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছিল। এবারও একই শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নিউইয়র্কে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বেলজিয়ামের রানিসহ শীর্ষ কূটনীতিক ও নেতৃবৃন্দের বৈঠক

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ডলারের পতন যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, তবে এটি বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের আধিপত্যের ওপর প্রশ্ন তুলতে পারে। যদিও এখনও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ঋণ নিষ্পত্তিতে ডলারের বিকল্প নেই, তবে চীন, রাশিয়া, এমনকি কিছু আরব দেশ নিজেদের মুদ্রায় বাণিজ্যের উদ্যোগ বাড়াচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে ডলারের অবস্থান নিয়ে ভূরাজনৈতিক আলোচনাও আরও তীব্র হতে পারে।

সব মিলিয়ে মার্কিন শাটডাউন এখন শুধু আমেরিকার অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। ডলারের দরপতন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, রপ্তানি-আমদানি, ঋণ ও বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। আর এভাবেই ২০২৫ সাল হয়তো ইতিহাসে লেখা থাকবে ডলারের ২২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বার্ষিক পতনের বছর হিসেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত