প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ‘২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাংবাদিকদের সংঘর্ষ এবং দুর্ব্যবহারের অভিযোগ সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ঘটনার ফলে যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফেরার সময় দলের শীর্ষনেতাদের সঙ্গে সাংবাদিকরা সংবাদ সম্মেলন বর্জন করতে বাধ্য হয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে এনসিপির দলের অংশ হিসেবে ঢাকা ছাড়েন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল। সফরটি শুরু হয় ২২ সেপ্টেম্বর, এবং নয় দিনের সফরের পর বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় তারা ঢাকায় ফেরেন। সফরসঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির, জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতারা এবং এনসিপির গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দ।
বিমানবন্দর পরিদর্শনরত সাংবাদিকদের বরাত দিয়ে জানা যায়, হুমায়ূন কবির সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় এনসিপির নেতাকর্মীরা দলের প্রধান প্রতিনিধি আখতার হোসেন এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারাকে ফুল দিয়ে বরণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু এই সময় নেতাকর্মীদের উচ্চস্বরে স্লোগান ও উত্তেজনাপূর্ণ আচরণের কারণে সাংবাদিকদের বক্তব্য শোনায় বাধা সৃষ্টি হয়। এ সময় সাংবাদিকরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের বক্তব্য প্রকাশের জন্য অনুরোধ করলে, কয়েকজন কর্মী সাংবাদিকদের সঙ্গে উদ্ভট ও অশোভন আচরণ শুরু করেন।
ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শী এক সাংবাদিক বলেন, “আমরা শুধু আমাদের প্রশ্ন করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু উচ্ছ্বাসিত কর্মীরা আমাদের কথা শোনার সুযোগই দিল না। কয়েকজন আমাদের দিকে অশ্লীলভাবে আচরণ করায় পরিস্থিতি তীব্র হয়ে ওঠে। এতে আমরা নিরাপত্তার কথা ভেবেই সংবাদ সম্মেলন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিই।”
ঘটনার পরপরই এনসিপির পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি জারি করা হয়। সেখানে ঘটনা “দুঃখজনক ও নিন্দনীয়” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং যারা দায়ী তাদের চিহ্নিত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিবৃতিতে দলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা গেছে, ক্ষুব্ধ সাংবাদিকরা সংবাদ সম্মেলন বর্জন করে চলে যাচ্ছেন। ভিডিওতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, এনসিপির কয়েকজন নেতা সাংবাদিকদের ফিরে আসার অনুরোধ করলেও তারা আর ফিরে আসেননি। এ ঘটনায় বিমানবন্দর এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং অন্যান্য যাত্রী ও পর্যবেক্ষকরা চরম বিভ্রান্তিতে পড়ে যান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এমন ঘটনা শুধুমাত্র গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে উত্তেজনা নয়, বরং রাজনৈতিক দলের শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের ব্যর্থতারও প্রকাশ। তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক সফর শেষে দলের নেতারা স্বাগত জানাতে আগ্রহী হলেও সুশৃঙ্খলভাবে তা আয়োজন না করার ফলে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে সাংবাদিকদের সঙ্গে এমন আচরণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও প্রকাশের অধিকারকে চ্যালেঞ্জ করছে।
সাংবাদিকদের সংগঠনও এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, “সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ ও জনগণের কাছে সত্য প্রকাশ করতে সক্ষম হওয়া উচিত। কোনো রাজনৈতিক দল বা কর্মী এ অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। আমরা দৃঢ়ভাবে এ ধরনের আচরণের নিন্দা জানাচ্ছি।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা পুনরায় এড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের কর্মীদের প্রতি আরও কঠোর নির্দেশনা দিতে হবে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সফরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে সৌজন্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে দলের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ও নিয়মনীতি আরও কঠোর করা উচিত।
নিরীক্ষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দলের নেতাদের ঢাকায় আগমনে স্বাভাবিকভাবে গণমাধ্যমের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। সাধারণত সাংবাদিকরা নানান প্রশ্নের মাধ্যমে সফরের ফলাফল, আলোচনা ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রভাব যাচাই করতে চায়। কিন্তু বিমানবন্দর থেকে শুরু হওয়া উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সাংবাদিকদের পেশাদার কাজকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এতে দলের প্রতি জনগণের আস্থা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নও উত্থাপিত হয়েছে।
এনসিপির অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, দলের উচ্চপদস্থ নেতারা এ ধরনের ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তারা আরও বলছেন, প্রাথমিক তদন্তে দেখা যাচ্ছে, সংঘর্ষ মূলত কিছু অশান্ত ও উদ্দীপিত নেতাকর্মীর কারণে সৃষ্টি হয়েছে, যারা দলের মানসম্পন্ন আচরণ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। দলের শীর্ষ নেতারা ইতিমধ্যে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে সতর্কতার নির্দেশ দিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দল যখন আন্তর্জাতিক সফর বা গুরুত্বপূর্ণ সভায় অংশগ্রহণ করে, তখন সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতি স্বাভাবিক এবং গণমাধ্যমকে সহযোগিতা করা বাধ্যতামূলক। তবে ঘটনার মতো আচরণ দলের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে, যা ভোটারদের মনোভাবেও প্রভাব ফেলতে পারে।
একই সঙ্গে, নাগরিক সমাজ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এ ঘটনায় সাড়া দিয়েছে। তারা বলছে, গণমাধ্যমকে সহায়তা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের ও রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিমানবন্দরে এমন উত্তেজনা শুধু সাংবাদিকদের কাজকেই বাধাগ্রস্ত করেনি, সাধারণ যাত্রী ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষককেও অস্বস্তিতে ফেলেছে।
এদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, সমস্যা সমাধানের জন্য একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি দায়িত্বশীল কর্মীদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এছাড়া দলের নেতারা গণমাধ্যমের সঙ্গে পুনরায় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা রাজনৈতিক দলের শৃঙ্খলা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক সফরের সময় সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে একটি গুরুতর সতর্কবার্তা দিয়েছে। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের কর্মীদের আচরণ ও শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আরও জোর দিতে হবে, যাতে সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে এবং নিরাপদে তাদের কাজ করতে পারেন।