প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ‘২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ইসরায়েল কর্তৃক গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় হামলা ও ত্রাণযান জব্দের ঘটনাকে ঘিরে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে এবং মানবিক উদ্যোগকে প্রতিহত করায় ইসরায়েলকে নিন্দা জানাচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংস্থা ও নাগরিক সমাজ। এরই ধারাবাহিকতায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বৃহস্পতিবার এক বিবৃতি দিয়ে জানায়, তারা আজ শুক্রবার সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে।
বিবৃতিতে দলটির যুগ্মমহাসচিব ও মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, ইসরায়েল মানবতার পরিপন্থী বর্বর শক্তি। তারা আন্তর্জাতিক আইন মানে না এবং নিজেদের স্বার্থে মানবিক উদ্যোগেও আঘাত হানতে দ্বিধা করে না। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা ছিল গাজায় খাদ্য, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় দ্রব্য পৌঁছে দেওয়ার এক অনন্য আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা। প্রায় ৪৪টি দেশের ৫০০ এরও বেশি মানুষ এতে অংশ নিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের নাগরিক ছাড়াও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধি, চিকিৎসক, মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক এবং আইনজীবীরা ছিলেন এই বহরে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এতে অংশ নেন বিশিষ্ট আলোকচিত্রী শহিদুল আলম। অথচ ইসরায়েল তা সশস্ত্রভাবে প্রতিহত করে ত্রাণসামগ্রী জব্দ করেছে।
গাজী আতাউর রহমান তার বিবৃতিতে আরও বলেন, এটি আসলে গোটা বিশ্বের সঙ্গে এক প্রকার যুদ্ধ ঘোষণা। ইসরায়েল এখনই প্রতিহত করা না হলে তারা একদিন ইউরোপের নাগরিকদেরও একইভাবে হুমকির মুখে ফেলবে। ইউরোপীয় দেশগুলো এখন কী পদক্ষেপ নেয় সেটিই হবে মূল পরীক্ষা—তারা কি নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, নাকি ইসরায়েলের আগ্রাসনের কাছে নীরব থাকবে। তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতিও আহ্বান জানান, শহিদুল আলমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক মানবিক উদ্যোগে ইসরায়েলের বর্বরতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বরকে আরও উচ্চকিত করতে হবে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঘোষণা দিয়েছে, আজ শুক্রবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হবে। এতে দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও মহানগরে দলের নেতাকর্মীরা অংশ নেবেন। তারা স্লোগান ও প্রতিবাদের মাধ্যমে ইসরায়েলের আগ্রাসী আচরণের নিন্দা জানাবেন এবং আন্তর্জাতিক মহলকে এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানাবেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা ছিল মানবিক সহায়তার এক প্রতীকী প্রচেষ্টা। এই ফ্লোটিলা গাজার অবরুদ্ধ জনগোষ্ঠীর কাছে আন্তর্জাতিক সহমর্মিতা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়েই যাত্রা করেছিল। কিন্তু ইসরায়েলের হামলা এবং ত্রাণসামগ্রী জব্দ আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করেছে। এমনকি যারা ফ্লোটিলায় ছিলেন তারা নিজেরাও এখন ঝুঁকির মুখে আছেন।
এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ইসরায়েলের এই আচরণকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু সদস্য রাষ্ট্রও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যদিও এখনো পর্যন্ত কোনো দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বড় ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি। অনেকের মতে, পশ্চিমা দেশগুলোর নীরবতা ইসরায়েলকে আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
বাংলাদেশের মানবাধিকারকর্মীরাও এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, গাজার মানুষের কাছে সাহায্য পৌঁছে দেওয়া মানবিক দায়িত্ব, অথচ সেটিকে রুদ্ধ করা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার্ত, নিপীড়িত ও যুদ্ধপীড়িত মানুষের জন্য ভয়াবহ বার্তা বয়ে আনছে।
আজকের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইসলামী আন্দোলনের নেতারা জানিয়েছেন, তারা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ পালন করবেন এবং সরকারকেও একই সঙ্গে অনুরোধ করবেন যাতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসলামী আন্দোলনের এই কর্মসূচি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের ক্ষোভ ও প্রতিবাদের প্রতিফলন। তবে আন্তর্জাতিক মহলের দৃঢ় ভূমিকা ছাড়া এ ধরনের মানবিক উদ্যোগে হামলা বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই এখনই সময় জাতিসংঘ ও বড় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সক্রিয় হস্তক্ষেপের।
ইসরায়েলের এ ধরনের কর্মকাণ্ড আগেও হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে গাজায় ত্রাণবাহী নৌযানে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০১০ সালে মাভি মারমারা নামের তুর্কি জাহাজে ইসরায়েলি সেনাদের হামলায় বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছিলেন। সেই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মহল নিন্দা জানালেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এবারও একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল, যা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আজকের বিক্ষোভ কর্মসূচির মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ শুধু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবে না, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও মানবিক দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানাবে। কারণ, গাজার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অবরুদ্ধ এবং তাদের মানবিক সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। খাদ্য, পানি, ওষুধের সংকট তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা ছিল আশার প্রদীপ, কিন্তু ইসরায়েলের আক্রমণে সেটি নিভে গেছে।
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই বিক্ষোভ কেবল বাংলাদেশের রাজনীতিতেই আলোড়ন সৃষ্টি করবে না, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ইসরায়েল-বিরোধী জনমতের প্রতিফলন ঘটাবে। তবে শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—বিশ্ব শক্তিগুলো কি সত্যিই মানবতার পাশে দাঁড়াবে, নাকি রাজনৈতিক স্বার্থে ইসরায়েলের আগ্রাসনকে প্রশ্রয় দেবে।