প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ‘২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের স্বর্ণের বাজারে আবারও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সম্প্রতি নতুন দাম ঘোষণা করেছে, যা আজ শুক্রবার (৩ অক্টোবর) কার্যকর রয়েছে। এবার ভরিপ্রতি স্বর্ণের দাম বেড়েছে ২ হাজার ৪১৫ টাকা। এতে করে স্বর্ণের দামে নতুন রেকর্ড তৈরি হলো। বাজুসের বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে ভরিপ্রতি ১ লাখ ৯৫ হাজার ৩৮৪ টাকা।
এই সিদ্ধান্তে দেশের বাজারে স্বর্ণের ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে নানামুখী প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদিকে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতেই স্থানীয় বাজারে এ সমন্বয় করা হয়েছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ এবং ক্রেতাদের বড় একটি অংশ উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, কারণ ক্রমাগত স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
স্বর্ণ বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। বিয়ে থেকে শুরু করে সামাজিক নানা অনুষ্ঠান, এমনকি বিনিয়োগের অন্যতম নিরাপদ মাধ্যম হিসেবেও স্বর্ণ ব্যবহৃত হয়। ফলে এর দামের ওঠানামা সরাসরি প্রভাব ফেলে সাধারণ মানুষের জীবনে। বিয়ের মৌসুম কিংবা উৎসবের সময় স্বর্ণের চাহিদা বেড়ে যায়, কিন্তু দাম অতিরিক্ত বেড়ে গেলে সেই চাহিদা পূরণ করতে হিমশিম খেতে হয় ক্রেতাদের।
বাজুস জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে স্থানীয় বাজারে এ সমন্বয় করতে হয়েছে। স্থানীয়ভাবে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) মূল্য বাড়ায় নতুন এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রতি ভরির সঙ্গে অতিরিক্ত ৫ শতাংশ সরকার নির্ধারিত ভ্যাট এবং বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি যোগ করতে হবে। তবে গহনার নকশা ও মানভেদে মজুরির পরিমাণ আরও ভিন্ন হতে পারে। অর্থাৎ, বাজারদরে নির্ধারিত মূল্যের সঙ্গে গহনার ধরণ ও নকশার ভিত্তিতে অতিরিক্ত খরচ যোগ হয়, যা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য আরও চাপে ফেলে।
বাংলাদেশের স্বর্ণের বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে দাম বারবার বেড়েছে। গত এক বছরে কয়েক দফায় দাম বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন্তব্য করছেন যে, স্বর্ণ এখন সাধারণ মানুষের জন্য আর বিলাসী দ্রব্য নয়, বরং নাগালের বাইরে চলে গেছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে স্বর্ণ কেনা এখন একটি বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ববাজারে ডলারের দাম বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা স্বর্ণের দামের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, যখন অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পায়, তখন মানুষ স্বর্ণে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়। ফলে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ে এবং দামও বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে অস্থিতিশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে সুদের হার বৃদ্ধির কারণে স্বর্ণের দাম ক্রমাগত উর্ধ্বমুখী।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ার আরেকটি কারণ হলো মুদ্রাস্ফীতি। দেশীয় বাজারে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানিকৃত স্বর্ণের দাম বেড়ে যায়। যেহেতু বাংলাদেশে স্বর্ণ উৎপাদন হয় না এবং সম্পূর্ণভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাই আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় বাজারেও তার প্রভাব পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষ মনে করছেন, সরকারের উচিত এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া। বিশেষ করে স্বর্ণ আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক কমানো বা ভ্যাট ও ট্যাক্সে কিছুটা ছাড় দিলে দাম কিছুটা হলেও কমতে পারে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় না করলে কালোবাজারি এবং অবৈধভাবে স্বর্ণ চোরাচালান বেড়ে যাবে, যা রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হবে।
এছাড়া গহনার দোকান মালিকদেরও ভিন্ন প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অনেকে মনে করেন, দাম বাড়লেও দীর্ঘ মেয়াদে এটির প্রভাব ব্যবসার ওপর খুব একটা খারাপ হবে না। কারণ স্বর্ণের প্রতি মানুষের আকর্ষণ কমার সম্ভাবনা নেই। তবে স্বল্প মেয়াদে বিক্রি কিছুটা কমে যেতে পারে। আবার কিছু জুয়েলারি দোকানদার মনে করেন, ক্রেতারা যখন স্বর্ণের দাম নিয়ে হতাশ হন, তখন গহনার বিক্রি কমে যায় এবং ব্যবসায়ীদের জন্য তা আর্থিক চাপ তৈরি করে।
ঢাকার ভাটারা এলাকার বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, “আমার মেয়ের বিয়ে সামনে। অনেক আগে থেকে স্বর্ণ কেনার পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু প্রতি মাসেই দাম বাড়ছে। এখন যে দামে দাঁড়িয়েছে, তাতে আগের পরিকল্পনা মতো কেনা সম্ভব নয়।” এমন মন্তব্য করেছেন আরও অনেক সাধারণ ক্রেতা, যারা সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য স্বর্ণ কিনতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন।
অন্যদিকে, বিনিয়োগকারীরা এই দাম বৃদ্ধিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাদের মতে, যেহেতু স্বর্ণের দাম ক্রমাগত বাড়ছে, তাই এখন কিনলে ভবিষ্যতে আরও বেশি দামে বিক্রি করা যাবে। ফলে এটিকে তারা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন।
স্বর্ণের নতুন দাম ঘোষণার ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাজারে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, স্বর্ণ কেবল গহনা হিসেবেই নয়, বরং বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়, আন্তর্জাতিক লেনদেন এবং রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও সম্পর্কিত। ফলে এর দামের ঊর্ধ্বগতি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, স্বর্ণের দাম বাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং সমাজ জীবনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজুসের নতুন ঘোষণার ফলে আজকের বাজারে ২২ ক্যারেট স্বর্ণ ভরিপ্রতি ১ লাখ ৯৫ হাজার ৩৮৪ টাকা, ২১ ক্যারেট ১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৯৬ টাকা, ১৮ ক্যারেট ১ লাখ ৫৯ হাজার ৮৫৫ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ ভরিপ্রতি ১ লাখ ৩২ হাজার ৭২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ভবিষ্যতে এ দাম আরও বাড়বে নাকি কমবে, তা নির্ভর করবে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর। তবে আপাতত সাধারণ মানুষের কপালে ভাঁজই বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান এ স্বর্ণমূল্য নিয়ে বাজার, ব্যবসায়ী এবং ক্রেতা—তিন পক্ষেই তৈরি হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান, যা আগামী দিনে আরও তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দেবে বলেই মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।