নগরবাউল জেমসের ৬১ পদার্পন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬৫ বার
নগরবাউল জেমসের ৬১ পদার্পন

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলা সংগীতাঙ্গনের ইতিহাসে যখন কিংবদন্তি পপ তারকাদের নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন মাহফুজ আনাম জেমসের নাম সবার আগে আসে। ‘গুরু’, ‘নগরবাউল’ কিংবা ঝাঁকড়া চুলের সেই গিটারম্যান—যে নামেই ডাকুন, তার ভক্তদের মধ্যে উন্মাদনার শেষ থাকে না। ১৯৬৪ সালের ২ অক্টোবর নওগাঁয় জন্ম হলেও তিনি বড় হয়েছেন চট্টগ্রামে। আজ জেমস ৬১ বছরে পা রেখেছেন, বাংলা সংগীতের অমর কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

জেমসের জন্মদিনের উদযাপন ভক্তদের মধ্যে বরাবরই নানা আকর্ষণীয় আয়োজনের মাধ্যমে হয়ে আসত। ২০১৫ সালে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ১০টি বিলবোর্ড টাঙিয়ে কিশোরগঞ্জের যুবক প্রিন্স তাকে শুভেচ্ছা জানান। ২০১৭ সালে জন্মদিনে সারা দেশে এক কোটি গাছ লাগানো হয়। ২০১৮ সালেও নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ভক্তরা তাকে অভিনন্দন জানায়। তবে ২০১৮ সালের অক্টোবরে ঘনিষ্ঠ বন্ধু, কিংবদন্তি গিটারিস্ট আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পর জেমস নিজে অনুরোধ করেন ভক্তদের যেন আর কোনো জন্মদিনের আয়োজন না করা হয়। এরপর থেকে প্রতি বছর তার জন্মদিন নীরবতায় কেটে যায়। এ বছরও সে ধারা বজায় রেখেছেন তিনি।

বর্তমানে জেমস ‘নগরবাউল’ ব্যান্ডের প্রধান ভোকালিস্ট ও গিটারিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার ব্যান্ডের প্রাথমিক নাম ছিল ‘ফিলিংস’। ১৯৮৭ সালে ব্যান্ডের সঙ্গে প্রথম অ্যালবাম ‘স্টেশন রোড’ প্রকাশিত হয়। এক বছর পর একক অ্যালবাম ‘অনন্যা’ বের হয়, যা তাকে তৎকালীন বাংলা পপসংগীতে এক বিশেষ স্থান দান করে।

জেমস বাংলা ভাষায় প্রথম সাইকেডেলিক রকের সূচনা করেন। শুধুমাত্র গানেই নয়, গিটার বাজানোতেও তিনি নিখুঁত দক্ষ। দিনে দিনে তিনি বহু কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘পাগলা হাওয়া’, ‘মীরাবাঈ’, ‘মা’, ‘বাবা’, ‘ফুল নেবো না’, ‘এক নদী যমুনা’, ‘লিখতে পারি না কোনো গান’ প্রভৃতি। চলচ্চিত্রেও গানের মাধ্যমে তিনি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন।

তার কণ্ঠে ‘আসবার কালে আসলাম একা’, ‘তোর প্রেমে অন্ধ হলাম’, ‘আমি জেল থেকে বলছি’ ইত্যাদি গান সিনেমাপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি বলিউডেও জেমসের সঙ্গীত গ্রহণযোগ্যতা পায়। ২০০৫ সালে বলিউডের ‘গ্যাংস্টার’ সিনেমায় তিনি প্লেব্যাক করেছেন। তাঁর ‘ভিগি ভিগি’ গানটি এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বলিউড টপচার্টের শীর্ষে অবস্থান করে। এরপর ‘লামহে’ সিনেমায় ‘চল চলে’, ‘লাইফ ইন এ মেট্রো’ সিনেমায় ‘রিশতে’ ও ‘আলবিদা’ গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন।

জেমস মডেলিং জগতেও সক্রিয় ছিলেন। ২০০০ সালে পেপসির বিজ্ঞাপনে প্রথমবার দেখা যায় তাকে। ২০১১ সালে এনার্জি ড্রিংক ‘ব্ল্যাক হর্সে’র বিজ্ঞাপনে অংশ নেন। তিনি প্রযোজনার কাজে ও নিপুণ। গাজী আহমেদ শুভ্রের সঙ্গে ‘রেড ডট এন্টারটেইনমেন্ট’ নামে প্রডাকশন হাউস পরিচালনা করেন। ২০১১ সালে আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপের জন্য ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ শিরোনামের একটি ভিডিওচিত্র তৈরি করেন। এছাড়া বিভিন্ন রিয়্যালিটি শো প্রযোজনার মাধ্যমে তিনি টেলিভিশন দর্শকের মন জয় করেছেন। সম্প্রতি আলোকচিত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশও করেছেন।

জেমসের পারিবারিক জীবনও সুপরিকল্পিত। তিনি স্ত্রী বেনজির সাজ্জাদ, দুই কন্যা জান্নাত ও জাহান এবং এক পুত্র দানেশকে নিয়ে সুখী সংসার পরিচালনা করছেন। তবে ব্যক্তিগত জীবনকে প্রকাশ্যে আনা নিয়ে তিনি সর্বদা সংযমী ছিলেন।

বাংলা সংগীত ও সাইকেডেলিক রকের ইতিহাসে জেমসের অবদান অমূল্য। শুধু গান নয়, তার গিটার বাজানো, সৃজনশীলতা ও নতুন ধারার সূচনা তাকে বাংলা সংগীতের অমর প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ৬১ বছরে পা রাখলেও তার উপস্থিতি আজও নতুন প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস।

জেমসের শিল্পীজীবন থেকে পাওয়া শিক্ষা এবং তার সামাজিক দায়বদ্ধতা অনেক শিল্পী ও ভক্তদের জন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি যে কারণে ‘নগরবাউল’ নামে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে আছেন, তা কেবল তার গানের প্রতি অনুরাগী নয়, বরং বাংলার সংগীতপ্রেমী সমাজের জন্যও একটি প্রতীক।

বর্তমানেও জেমস বাংলা সংগীতের আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। ব্যান্ডের সঙ্গে তার নতুন উদ্যোগ, প্রযোজনা ও আলোকচিত্রের কাজ তাকে যুগোপযোগী ও সক্রিয় রাখছে। তার দীর্ঘ ক্যারিয়ার ও সৃষ্টিশীলতা দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে একটি শিল্পী নিজের সময় ও প্রতিভাকে ব্যবহার করে সমাজ ও সংস্কৃতিতে স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

৬১তম জন্মদিনে জেমসের নীরবতা দর্শক ও ভক্তদের হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলেছে। এই নীরবতা যেন তার জীবনের কঠোর পরিশ্রম, শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা এবং ব্যক্তিগত শোকের একটি চিহ্ন। নগরবাউল হিসেবে তিনি যে অবস্থান অর্জন করেছেন, তা কেবল পুরনো দিনের স্মৃতি নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি স্থায়ী দিকনির্দেশনা।

সার্বিকভাবে বলা যায়, মাহফুজ আনাম জেমস বাংলা সংগীতের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, যার সৃষ্টিশীলতা, প্রতিভা এবং ব্যক্তিত্ব বাংলা পপসংগীতের ইতিহাসে চিরস্থায়ী ছাপ রেখেছে। ৬১ বছরে পা রাখলেও তার সংগীত, প্রযোজনার কাজ এবং ব্যক্তিগত নৈতিকতা এখনও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করছে, যা তাকে সমকালীন বাংলা সংগীতের এক অমর প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com