প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বলিউডের রুপালী পর্দায় মূল ধারার পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি কোনো দীর্ঘ তালিকার চরিত্র দিয়ে সাজানো নয়। কয়েকটি হাতে গোনা বহুল আলোচিত আইটেম নম্বর বা বিশেষ নাচ আর বেশ কিছু জনপ্রিয় টক শো সঞ্চালনা—মূলত এইটুকুই তাঁর কাজের মূল ভিত্তি। অথচ রূপালী জগতের প্রথম সারির অনেক প্রতিষ্ঠিত নায়িকার চেয়েও তাঁর আবেদন ও গ্রহণযোগ্যতা বিন্দুমাত্র কম নয়। তিনি আর কেউ নন, বলিউডের অন্যতম আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব মালাইকা অরোরা। বয়স কিংবা সময়ের তোয়াক্কা না করে বছরজুড়েই খবরের শিরোনামে থাকেন এই গ্ল্যামার গার্ল। কখনো নিজের ঈর্ষণীয় ফিটনেস আর যোগব্যায়ামের রুটিন নিয়ে, কখনো ফ্যাশন সেন্স নিয়ে, আবার কখনো নিজের জটিল ব্যক্তিগত জীবন কিংবা প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে অবস্থান করেন তিনি। বিশেষ এই দিনে জীবনের আরও একটি বসন্ত পার করে ৫৩ বছর বয়সে পা দিলেন মালাইকা। তবে পাঁচ দশক পেরিয়েও সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে গ্ল্যামার দুনিয়ায় তিনি আজও সমানভাবে আলোচিত ও সমান চর্চিত এক অনবদ্য চরিত্র।
মালাইকার গ্ল্যামার জগতে প্রবেশের গল্পটি শুরু হয়েছিল মডেলিংয়ের র্যাম্প ধরে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে মডেল হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে ভারতীয় এমটিভির তৎকালীন তুমুল জনপ্রিয় ভিজে বা ভিডিও জকি হিসেবে দারুণ পরিচিতি পান। এমটিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘লাভ লাইন’ ও ‘স্টাইল চেক’ নিখুঁতভাবে উপস্থাপনা করে সেই সময়ের উদীয়মান তরুণ দর্শকদের মাঝে দ্রুত ব্যাপক জনপ্রিয়তা কুড়ান তিনি। এরপর তাঁর সাবলীল উপস্থিতি তাঁকে বিজ্ঞাপনী চিত্র, আন্তর্জাতিক ফ্যাশন রানওয়ে এবং সবশেষ হিন্দি চলচ্চিত্রের সুরের ভুবনে নিয়ে আসে।
১৯৯৮ সালটি মালাইকার জীবনের জন্য এক বিশাল মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো বছর ছিল। গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতা মণি রত্নম পরিচালিত কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘দিল সে’-এর ঐতিহাসিক ‘ছাইয়াঁ ছাইয়াঁ’ গানে বিশ্বখ্যাত অভিনয়শিল্পী কিংশুক শাহরুখ খানের সঙ্গে চলন্ত ট্রেনের ছাদে তাঁর শ্বাসরুদ্ধকর নাচ তাঁকে রাতারাতি আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। গানটি শুধু ওই নির্দিষ্ট ছবির মূল আকর্ষণ হয়েই থাকেনি, বরং বলিউডের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা নাচের দৃশ্যগুলোর একদম শীর্ষে নিজের স্থায়ী জায়গা করে নেয়। সেই শুরু, এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক সুপারহিট গানে নিজের অনন্য নাচের দক্ষতা দেখিয়েছেন তিনি। ‘কাঁটে’ ছবির রোমান্টিক ধাঁচের ‘মাহি ভে’, ‘ওয়েলকাম’ ছবির ধামাকা গান ‘হোঠ রসিলে’, ‘হাউসফুল ২’ ছবির মাতানো আইটেম গান ‘আনারকলি ডিসকো চালি’ এবং ‘দাবাং’ ছবির অবিস্মরণীয় ‘মুন্নি বদনাম হুই’ গানে নাচ পরিবেশন করে বলিউডে সম্পূর্ণ আলাদা ও অপ্রতিরোধ্য এক ট্রেন্ড তৈরি করেন মালাইকা। বিশেষ করে ২০১০ সালের ‘দাবাং’ ছবিতে সুপারস্টার সালমান খানের সঙ্গে তাঁর পরিবেশিত ‘মুন্নি বদনাম হুই’ গানটি তৎকালীন সব রেকর্ড ভেঙে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে, যা তাঁকে নতুন প্রজন্মের কোটি পাঠকের কাছেও নতুন করে চেনায়।
অন্যান্য অনেক অভিনেত্রীর ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট বৃত্তে আটকে পড়ার ভয় থাকলেও, মালাইকার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় শক্তি হলো তিনি কখনো নিজেকে একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ে বন্দি রাখেননি। মডেলিং, উপস্থাপনা ও নাচের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি সফলভাবে পা রেখেছেন টেলিভিশন রিয়েলিটি শো, ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি এবং এমনকি আধুনিক ব্যবসায়িক জগতে। ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় নাচের রিয়েলিটি শো ‘নাচ বালিয়ে’ কিংবা ‘ঝলক দিখলা যা’-এর মতো হিট অনুষ্ঠানগুলোতে অত্যন্ত সফলতার সাথে বিচারকের মূল দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। আর এই পদক্ষেপের কারণে মূলধারার চলচ্চিত্রে টানা অভিনয় না করেও টিভির মাধ্যমে কোটি কোটি দর্শকের সাথে তাঁর আত্মিক যোগাযোগের সেতুটি সবসময় অক্ষুণ্ণ ছিল। ২০২২ সালে প্রচারিত নিজস্ব ও ভিন্নধর্মী ওটিটি শো ‘মুভিং ইন উইথ মালাইকা’-তে নিজের বাস্তব জীবন, ক্যারিয়ার এবং নানা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অম্ল-মধুর অধ্যায়গুলো বেশ সাহস ও খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছিলেন তিনি, যা দর্শকদের পর্দার পেছনের বাস্তব মালাইকাকে একদম কাছ থেকে জানার সুযোগ করে দেয়। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে এক সাক্ষাৎকারে নিজের পুরো পেশাদার জীবনকে বিভিন্ন প্রতিভার এক অনন্য সমন্বয় হিসেবে বর্ণনা করেন এই তারকা। বর্তমানে নিজের ছেলে আরহান খানের সঙ্গে যৌথভাবে মুম্বাইয়ের বুকে ‘স্কারলেট হাউস’ নামের একটি অভিজাত রেস্তোরাঁ ব্যবসাও বেশ সাফল্যের সাথেই পরিচালনা করছেন তিনি।
বয়স পঞ্চাশের কোঠা পার করলেও শরীরচর্চা ও ফিটনেসের ব্যাপারে মালাইকার একনিষ্ঠতা ও সুনির্দিষ্ট রুটিন চিরকাল অনুপ্রেরণাদায়ক। তাঁর ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতা খুললেই প্রতিদিনের কঠিন যোগব্যায়াম, জিমনেসিয়ামে কঠিন শরীরচর্চার নানা প্রেরণাদায়ক ভিডিও চোখে পড়ে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের যত্ন নেওয়া ও শরীরকে কীভাবে সুস্থ রাখা যায়, সেই আলোচনায় মালাইকার নাম সবসময়ই ইতিবাচকভাবে উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে। কারণ তাঁর মতে, ফিটনেস শুধু বাইরে থেকে সুন্দর বা দৃষ্টিনন্দন দেখানোর বিষয় নয়, এটি মূলত নিজের আত্মসম্মান ও নিজেকে ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর মাধ্যম। তবে অনাহুত বিতর্কের জবাব দিতেও পিছপা হননি তিনি। ২০২৫ সালে নিজের ৫০তম জন্মদিনের গ্র্যান্ড উদযাপনের একাধিক ছবি সামাজিক মাধ্যমে উন্মুক্ত করে বয়স নিয়ে চলা সব অহেতুক জল্পনা-কল্পনার সগর্বে অবসান ঘটান তিনি। পরবর্তীতে ৫২ বছর বয়সে দাঁড়িয়েও একটি সিনেমায় বিশেষ গানে নাচার সুযোগ পেয়ে গর্ব প্রকাশ করেছিলেন তিনি। কারণ নাচ তাঁর কাছে কোনো বাধ্যবাধকতা নয়, বরং আত্মা প্রকাশের পরম মাধ্যম, আর এর জন্য কারও কাছে কখনো ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন তিনি বোধ করেন না।
ক্যারিয়ারের সাফল্য ও উজ্জ্বল আলোর পাশাপাশি মালাইকার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন নিয়ে অনুরাগী ও সাধারণ মানুষের গভীর আগ্রহ বহুকালের। ১৯৯৮ সালে অভিনেতা ও সফল প্রযোজক আরবাজ খানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। একটি জনপ্রিয় কফির বিজ্ঞাপনের মহরতে প্রথম পরিচয়ের পর থেকে প্রেমের শুরু এবং পরবর্তীতে বিয়েতে তা রূপ নেয়। তাঁদের একমাত্র সন্তান আরহান খানের জন্ম হয় ২০০২ সালে। সুন্দর সেই দাম্পত্য জীবন দীর্ঘ দুই দশক ধরে চলার পর ২০১৬ সালে হঠাৎ করেই তারা আলাদা থাকার কঠোর সিদ্ধান্ত নেন এবং সব জল্পনার ইতি টেনে ২০১৭ সালে তাঁদের আইনি বিবাহবিচ্ছেদ আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়।
বিচ্ছেদের পর তরুণ অভিনেতা অর্জুন কাপুরের সঙ্গে মালাইকার গভীর প্রেমের গুঞ্জন নিয়ে বলিপাড়ায় বহু জলঘোলা হয়েছে। বিভিন্ন পাবলিক ইভেন্টে একসাথে উপস্থিতি এবং ইন্টারনেটে সুন্দর ছবি প্রকাশের পর সেই সম্পর্ক আর গোপন থাকেনি। তবে তাঁদের বয়সের বড় ব্যবধান এবং জীবনের ভিন্ন সামাজিক সিদ্ধান্তের কারণে নেটিজেনদের অহেতুক মন্তব্যের শিকার হতে হয়েছে তাঁদের। ২০২৪ সালে অর্জুন প্রকাশ্যে নিজেকে অবিবাহিত বলে দাবি করার পর তাঁদের লম্বা সময়ের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার খবর একপ্রকার নিশ্চিত হয়ে যায়। একাধিক সাক্ষাৎকারে মালাইকা দৃঢ়ভাবে জানান, তাঁর পরা পোশাক, তাঁর বয়স কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে সমাজ সবসময় তাঁকে অহেতুক জাজ বা বিচার করেছে। তবে অন্যদের কাছে নিজের সিদ্ধান্ত বা জীবনের ব্যাখ্যার কৈফিয়ত দেওয়া বন্ধ করেই এখন তিনি জীবনে প্রকৃত শান্তি ও স্বস্তি খুঁজে পেয়েছেন।
মালাইকার অসাধারণ তারকা হয়ে ওঠার পেছনের রূপকথার গল্পটি শুরু হয়েছিল মূলত মডেলিংয়ের দুর্গম ও আকর্ষক র্যাম্প থেকে। শিক্ষাজীবন ও তারুণ্যের ঠিক প্রারম্ভে, মাত্র ১৭ বছর বয়সে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী পদচারণায় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে মডেল হিসেবে নিজের পেশাদার জীবন শুরু করেছিলেন তিনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সাবলীল উপস্থাপনা এবং ক্যামেরার সামনে স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতির সুবাদে তিনি ভারতের তৎকালীন জনপ্রিয় মিউজিক্যাল চ্যানেল এমটিভির ভিজে বা ভিডিও জকি হিসেবে দারুণ পরিচিতি লাভ করেন। এমটিভির সেই সময়কার সাড়া জাগানো জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘লাভ লাইন’ এবং তরুণদের ফ্যাশন নিয়ে তৈরি ‘স্টাইল চেক’ অত্যন্ত নিখুঁত ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনা করে তিনি দেশের উদীয়মান তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে দ্রুত বিশেষ স্থান করে নেন। টেলিভিশনের পর্দা ছাড়িয়ে তাঁর এই সাবলীল সুখ্যাতি খুব দ্রুতই তাঁকে নামী-দামী ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনী চিত্র, আন্তর্জাতিক মানের ফ্যাশন রানওয়ে এবং সবশেষ ভারতীয় চলচ্চিত্রের সুর ও নাচের রঙিন জগতে নিয়ে আসে।
১৯৯৮ সালটি মালাইকা অরোরার ব্যক্তিগত ও পেশাদার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক অতি গুরুত্বপূর্ণ বছর হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। গুণী ও খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা মণি রত্নম পরিচালিত কালজয়ী ও সাড়া জাগানো চলচ্চিত্র ‘দিল সে’-এর ঐতিহাসিক গান ‘ছাইয়াঁ ছাইয়াঁ’-তে তৎকালীন সময়ের মহাতারকা শাহরুখ খানের সঙ্গে চলন্ত ট্রেনের ছাদে তাঁর সেই অসামান্য ও শ্বাসরুদ্ধকর নাচ তাঁকে রাতারাতি ভারত ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। গানটি শুধু ওই নির্দিষ্ট চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক সাফল্যের অংশ হয়ে থাকেনি, বরং ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা ও সবচেয়ে জনপ্রিয় নাচের দৃশ্যগুলোর একদম শীর্ষ তালিকায় নিজের স্বর্ণোজ্জ্বল স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। সেই অবিস্মরণীয় সূচনার পর তাঁকে আর কখনো পেছনের দিকে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক সুপারহিট চলচ্চিত্রে বিশেষ গানে নিজের অনন্য ও বৈচিত্র্যময় নাচের কৌশল প্রদর্শন করে তিনি নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। ‘কাঁটে’ চলচ্চিত্রের রোমান্টিক ধাঁচের আলোড়ন তোলা গান ‘মাহি ভে’, ‘ওয়েলকাম’ চলচ্চিত্রের চোখ ধাঁধানো গান ‘হোঠ রসিলে’, ‘হাউসফুল ২’ চলচ্চিত্রের প্রাণবন্ত গান ‘আনারকলি ডিসকো চালি’ এবং মহাতারকা সালমান খানের সঙ্গে ‘দাবাং’ চলচ্চিত্রের অপ্রতিরোধ্য ও সর্বকালের অন্যতম সেরা হিট গান ‘মুন্নি বদনাম হুই’-এ অত্যন্ত মোহনীয় নাচ পরিবেশন করে তিনি বলিউডে সম্পূর্ণ আলাদা একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেছিলেন। বিশেষ করে ২০১০ সালের ‘দাবাং’ ছবির সেই ‘মুন্নি বদনাম হুই’ গানটি মুক্তি পাওয়ার পর তা আগের সমস্ত রেকর্ড নিমেষেই ভেঙে চুরমার করে দেয় এবং নতুন প্রজন্মের কোটি কোটি দর্শকের হৃদয়ে তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। মূলত তাঁর নিখুঁত নাচের দক্ষতা, ক্যামেরার সামনে অতুলনীয় বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এবং যেকোনো চরিত্রে নিজের আত্মবিশ্বাসী অভিব্যক্তিই তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান বিশেষ গানের শিল্পী ও আইকনে পরিণত করেছে।
সমসাময়িক অনেক তারকার বিপরীতে গিয়ে মালাইকার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব বা স্বকীয়তা হলো, তিনি কখনো নিজেকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডি বা পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখেননি। মডেলিং, উপস্থাপনা এবং আইটেম গানের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি অত্যন্ত সফলভাবে বহুমুখী পদচারণা করেছেন টেলিভিশন রিয়েলিটি শো, করপোরেট ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি এমনকি আধুনিক নানা ব্যবসায়িক উদ্যোগেও। ভারতীয় টেলিভিশনের পর্দায় সবচেয়ে জনপ্রিয় ও হাই-ভোল্টেজ নাচের রিয়েলিটি শো যেমন ‘নাচ বালিয়ে’ কিংবা ‘ঝলক দিখলা যা’-এর মতো দর্শকপ্রিয় অনুষ্ঠানগুলোতে অত্যন্ত মেধার সঙ্গে প্রধান বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। আর এই বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপের কারণে মূলধারার চলচ্চিত্রে নিয়মিত নায়িকা হিসেবে অভিনয় না করেও টেলিভিশনের মাধ্যমে তিনি এদেশের সাধারণ মানুষের ঘরের মানুষের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পেরেছেন। ২০২২ সালে তাঁর জীবনের অজানা দিকগুলো উন্মোচন করতে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত হয় তাঁর নিজস্ব ও সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী রিয়েলিটি শো ‘মুভিং ইন উইথ মালাইকা’। এই বিশেষ অনুষ্ঠানটি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, কাজের প্রতি একাগ্রতা এবং নানা জটিল অভিজ্ঞতার অম্ল-মধুর অধ্যায়গুলোকে অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে দর্শকের সামনে তুলে ধরেছিল। এর মাধ্যমে পর্দার বাইরের আসল মালাইকাকে একদম কাছাকাছি থেকে উপলব্ধি করার সুযোগ পেয়েছিল তাঁর ভক্তকুল। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে দেশের এক প্রভাবশালী গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মালাইকা নিজের পুরো পেশাদার জীবনকে নানামুখী কাজের এক সুষম সমন্বয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। ফ্যাশন মডেলিং থেকে শুরু করে ছোটপর্দার উপস্থাপনা, অভিনয়, নাচ এবং করপোরেট ব্যবসা—সবকিছুকে নিখুঁতভাবে মিলিয়েই তিনি নিজের স্বাধীন পরিচয় গড়ে তুলতে চেয়েছেন। বর্তমানে মুম্বাইয়ের অভিজাত এলাকায় নিজের একমাত্র সন্তান আরহান খানের সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বে ‘স্কারলেট হাউস’ নামের একটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক রেস্তোরাঁ ব্যবসা পরিচালনার সঙ্গেও তিনি নিবিড়ভাবে যুক্ত রয়েছেন।
বয়স পঞ্চাশের মাইলফলক পেরিয়ে যাওয়ার পরও নিজের শারীরিক ফিটনেস এবং শরীরচর্চার একনিষ্ঠ রুটিনের প্রতি মালাইকার মনোযোগ ও আগ্রহ এতটুকুও কমেনি, যা বিশ্বজুড়ে তাঁর কোটি কোটি ভক্তকে প্রতিনিয়ত বিস্মিত করে। তাঁর ব্যবহৃত ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতাগুলো খুললেই প্রতিদিনের কঠিন যোগব্যায়াম, অ্যাথলেটিক জিম সেশন এবং বিভিন্ন ফিটনেস ওয়ার্কআউটের নানা প্রাণবন্ত ছবি ও ভিডিও দেখতে পাওয়া যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের শরীরকে সুস্থ রাখা, মেটাবলিজম ধরে রাখা এবং মনের শান্তি বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যখনই কোনো স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনা ওঠে, তখনই উদাহরণ হিসেবে মালাইকার নাম অত্যন্ত জোরালোভাবে সামনে চলে আসে। কারণ তাঁর ব্যক্তিগত দর্শন অনুযায়ী, ফিটনেস কোনো বাহ্যিক সৌন্দর্য প্রদর্শনের সংকীর্ণ মাধ্যম নয়, এটি মূলত নিজের প্রতি নিজের ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ এবং সুস্থ জীবনযাপনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে বয়স নিয়ে সমাজে চলা ফিসফিসানি ও কটূক্তির কড়া জবাব দিতেও তিনি কখনোই পিছপা হননি। ২০২৫ সালে নিজের জীবনের ৫০তম জন্মদিনের বর্ণাঢ্য উদযাপনের একাধিক সুদৃশ্য ছবি নিজের সোশ্যাল হ্যান্ডেলে প্রকাশ করে তিনি বয়স নিয়ে চলা তাবৎ জল্পনা-কল্পনার অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ও সার্থক অবসান ঘটিয়েছিলেন। এমনকি তার পরের বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ৫২ বছর বয়সে এসেও একটি বহুল আলোচিত চলচ্চিত্রে অত্যন্ত সাবলীলভাবে বিশেষ গানে নাচতে পারার সাফল্যে প্রকাশ্যে নিজের গভীর গর্ব প্রকাশ করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠা বোধ করেননি। তাঁর অটল বক্তব্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট—নাচ এবং শিল্প চর্চা তাঁর কাছে আত্মা প্রকাশের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম, আর নিজের এই ভালোবাসার প্রকাশের জন্য তাঁকে কখনোই সমাজের কাছে কোনো ধরনের কৈফিয়ত দিতে হবে না বা ক্ষমা চাইতে হবে না।
পেশাগত সাফল্যের অন্তহীন আলোর পাশাপাশি মালাইকার বর্ণিল ব্যক্তিগত জীবন এবং পারিবারিক টানাপোড়েন নিয়ে অনুরাগীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আগ্রহের কোনো অন্ত ছিল না। ১৯৯৮ সালে বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা ও সফল চলচ্চিত্র প্রযোজক আরবাজ খানের সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্কে জড়ানোর পর তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। একটি নামী কফির বিজ্ঞাপনের শুটিং সেটে প্রথম পরিচয়ের মাধ্যমে তাঁদের সম্পর্কের সূত্রপাত ঘটেছিল, যা পরবর্তীতে দীর্ঘস্থায়ী দাম্পত্য জীবনে রূপ নিয়েছিল। এই দম্পতির কোল আলো করে ২০০২ সালে জন্ম নেয় তাঁদের একমাত্র সন্তান আরহান খান। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে সুখে-দুঃখে সংসার করার পর ২০১৬ সালে এসে তাঁদের দীর্ঘ দাম্পত্যে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয় এবং তাঁরা পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে আলাদা থাকার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২০১৭ সালে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাঁদের আনুষ্ঠানিক বিবাহবিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়।
আরবাজ খানের সঙ্গে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর বলিউডের তরুণ ও প্রতিভাবান অভিনেতা অর্জুন কাপুরের সঙ্গে মালাইকার জমজমাট প্রেমের গুঞ্জন নিয়ে বলিপাড়ায় বহু বছর ধরে বিস্তর জলঘোলা হয়েছে। দেশের নানা প্রান্তের বিলাসবহুল অনুষ্ঠানে তাঁদের একসঙ্গে উপস্থিতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে কাটানো অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি প্রকাশের পর সেই প্রেমের সম্পর্ক আর পর্দার আড়ালে থাকেনি। একসময় তা সম্পূর্ণ প্রকাশ্যেই দাপ্তরিক রূপ লাভ করে। তবে তাঁদের দুজনের বয়সের আকাশচুম্বী ব্যবধান, আধুনিক জীবনবোধ এবং সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পরিণতির কথা বিবেচনা করে সমাজের রক্ষণশীল একটি অংশ ও নেটিজেনরা তাঁদের বিভিন্ন সময়ে তীব্র কটূক্তি ও নেতিবাচক মন্তব্যের শিকারে পরিণত করেছিল। বিশেষ করে ২০২৪ সালের দিকে অভিনেতা অর্জুন কাপুর জনসমক্ষে নিজেকে অবিবাহিত বলে দাবি করার পর তাঁদের দীর্ঘদিনের সেই বহুল আলোচিত প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার গুঞ্জন আরও বহুগুণ জোরালো হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে দেশের এক শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া এক খোলামেলা সাক্ষাৎকারে মালাইকা দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন যে, তাঁর পরনের পোশাকের স্বাধীনতা, তাঁর বয়স কিংবা তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভালো-মন্দ—সবকিছু নিয়েই সমাজ তাঁকে সবসময় নির্দয়ভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে এবং বিচার করেছে। তবে অন্যদের তুষ্ট করার জন্য নিজের ব্যক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্তের কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার পরই তিনি মূলত মনের প্রকৃত শান্তি ও স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন বলে জানান।
মালাইকার সমগ্র জীবনচরিত যেন সম্পূর্ণ নিজের তৈরি শর্তে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার এক সাহসী ও অনুপম দলিল। তাঁর পোশাকের আধুনিক ধরন, জিম সেশনের সাহসী স্টাইল, অনবদ্য ও ছন্দময় নাচ কিংবা সম্পর্কের জটিল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত—প্রতিটি বাঁকেই তাঁকে প্রায়শই সামাজিক ট্রোল ও অযাচিত সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি কখনো নিজের পছন্দের সৃষ্টিশীল কাজ থেকে কিংবা জীবনযাপনের স্বাচ্ছন্দ্য থেকে একচুলও পিছিয়ে আসেননি। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখতে এবং শিল্পের চর্চা অব্যাহত রাখতে কখনো কোনো অন্ধ সমালোচকের ভয়ে পিছু হটা উচিত নয়। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, সব অনাহুত সমালোচনাকে একপাশে সরিয়ে রেখে ৫৩ বছর বয়সে এসেও তিনি আধুনিক ও আত্মবিশ্বাসী নারীদের জন্য এক অনুকরণীয় আলোকবর্তিকা হিসেবে মাথা উঁচু করে বেঁচে আছেন।
মালাইকার পুরো জীবনটাই যেন নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে বাঁচার এক অনন্য দলিল। পোশাকের ধরন, জিমের পোশাক, অনবদ্য নাচ কিংবা সম্পর্কের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত—প্রতিটি পদক্ষেপেই তাঁকে ট্রোলের শিকার হতে হলেও তিনি কখনো নিজের পছন্দের অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসেননি। তিনি বিশ্বাস করেন, নিজের স্বকীয়তা ও শিল্পচর্চা বজায় রাখতে কারো সমালোচনার ভয়ে পিছু হটা একেবারেই অনুচিত। জীবনকে নিজের শর্তে সাজিয়ে, সব সমালোচনাকে হাসিমুখে তুড়ি মেরে উড়িয়ে ৫৩ বছরে দাঁড়িয়েও তিনি আধুনিক নারীদের স্বাধীন ও আত্মবিশ্বাসী জীবনযাত্রার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত