সুন্দরবনে কোস্টগার্ডের অভিযান জাহাঙ্গীর বাহিনী পিছু হটল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩০ বার
সুন্দরবনে কোস্টগার্ডের অভিযান জাহাঙ্গীর বাহিনী পিছু হটল

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সুন্দরবন আবারও প্রমাণ করল তার সৌন্দর্যের পাশাপাশি এটি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ একটি অঞ্চল। শুক্রবার ভোরে পরিচালিত কোস্টগার্ডের বিশেষ অভিযানে উদ্ধার করা হয় পণবন্দি চার জেলে, উদ্ধার করা হয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ, পালিয়ে যায় কুখ্যাত জাহাঙ্গীর বাহিনী। এই ঘটনায় আবারও সামনে এল দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনে সক্রিয় জলদস্যু ও ডাকাত বাহিনীর নির্মম চিত্র।

ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, শিবসা নদীর সংলগ্ন আড়বাউনি খাল এলাকায় বেশ কয়েকজন জেলেকে অপহরণ করে আটকে রেখেছিল জাহাঙ্গীর বাহিনী। দীর্ঘ ১০ দিন ধরে তাদের বন্দি করে রাখা হয়, মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে চলে শারীরিক নির্যাতন ও ভয়ভীতি প্রদর্শন। বিষয়টি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেয়ে কোস্টগার্ড বেইস মোংলা ও আউটপোস্ট নলিয়ান এক যৌথ অভিযান পরিচালনা করে। ভোরের নিরবতা ভেদ করে কোস্টগার্ড সদস্যরা ডাকাতদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায়। কিন্তু ডাকাতরা আত্মসমর্পণ না করে পালিয়ে যায় বনের গভীরে। এর আগে কোস্টগার্ড সদস্যরা দুটি ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে সতর্কতা প্রদান করে। আতঙ্কিত ডাকাতরা বোট ও বন্দিদের রেখে পালিয়ে যায়।

অভিযান শেষে কোস্টগার্ড সদস্যরা ডাকাতদের ফেলে যাওয়া বোট তল্লাশি চালায়। উদ্ধার হয় একটি একনলা বন্দুক, দুটি এয়ারগান এবং তিন রাউন্ড তাজা কার্তুজ। একই সঙ্গে উদ্ধার করা হয় দীর্ঘদিনের বন্দিদশায় থাকা চার জেলেকে। উদ্ধারকৃতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারা জানিয়েছেন, গত দশ দিন ধরে নির্যাতন করে মুক্তিপণ দাবি করছিল ডাকাত বাহিনী। জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্যরা তাদের হাতে বেঁধে রাখত এবং প্রতিদিন ভয় দেখাত, মুক্তিপণ না পেলে হত্যা করা হবে।

কোস্টগার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক এক বিবৃতিতে জানান, অভিযান সফলভাবে শেষ হলেও এখনও মূল অপরাধীরা ধরা পড়েনি। তবে অস্ত্র-গোলাবারুদ জব্দ এবং জেলে উদ্ধারের মাধ্যমে বড় একটি সাফল্য এসেছে। তিনি বলেন, “সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখতে কোস্টগার্ড ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রাখবে।”

অভিযানের পর স্থানীয় জেলেদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এলেও আতঙ্ক পুরোপুরি কাটেনি। তারা বলছেন, সুন্দরবনে মাছ ধরা ও কাঁকড়া সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রায়ই ডাকাত বাহিনীর কবলে পড়তে হয়। মুক্তিপণ না দিতে পারলে মারধর, জিম্মি করা বা প্রাণনাশের হুমকি তাদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও কয়েক বছর আগে সরকারের উদ্যোগে বেশ কয়েকটি দস্যু বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল, কিন্তু নতুন করে ছোট ছোট বাহিনী আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সুন্দরবনে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান ডাকাত সমস্যার পেছনে রয়েছে সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য, দারিদ্র্য ও বিকল্প জীবিকার অভাব। জেলে ও বনজীবীরা প্রায়ই প্রভাবশালী চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েন। তারা মনে করেন, শুধু সামরিক অভিযান নয়, পাশাপাশি সুন্দরবনের জনপদে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা জোরদার করাই এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের স্থায়ী সমাধান হতে পারে।

অন্যদিকে প্রশাসন বলছে, এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকায় ডাকাতরা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। কিন্তু সুন্দরবনের অবারিত প্রাকৃতিক পরিবেশ ও অসংখ্য খাল-নদী তাদের আশ্রয়স্থল হওয়ায় পুরোপুরি নির্মূল করতে সময় লাগছে। প্রতি বছর হাজার হাজার জেলে জীবিকার জন্য সুন্দরবনে প্রবেশ করে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এই ঘটনায় উদ্ধার হওয়া জেলেদের পরিবারে আনন্দের পাশাপাশি স্বস্তি ফিরে এসেছে। পরিবারের সদস্যরা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গত কয়েকদিন তারা ছিলেন দুশ্চিন্তায়, কখন কোন খবর আসে সেই অপেক্ষায়। এখন তারা চান, যেন আর কোনো জেলে ডাকাতদের হাতে বন্দি না হয়।

অভিযানে উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ করে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে কোস্টগার্ড। উদ্ধারকৃত জেলেদের চিকিৎসা ও জবানবন্দি সম্পন্ন হলে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

এ ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, সুন্দরবনে জেলেদের জীবিকা এখনও কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতি মৌসুমে শত শত জেলে মাছ ও কাঁকড়ার সন্ধানে এই বনে প্রবেশ করে, কিন্তু তাদের অনেকেই আর ফিরে আসতে পারেন না। ডাকাত, দস্যু ও জলদস্যুদের কবলে পড়ে তারা হারান স্বাধীনতা, সম্পদ এবং কখনো কখনো প্রাণও।

বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। কিন্তু এ ধরনের নতুন বাহিনীর উত্থান এবং পুরনো বাহিনীর সক্রিয়তা আবারও প্রমাণ করে, শুধু আত্মসমর্পণ বা সামরিক অভিযান নয়, বরং বহুমুখী উদ্যোগই পারে স্থায়ী সমাধান দিতে।

শুক্রবারের সফল অভিযানে চার জেলের মুক্তি ঘটলেও, সুন্দরবনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ থেকে যাচ্ছে। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শুধু কোস্টগার্ড বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, বরং স্থানীয় মানুষ, প্রশাসন এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে একমাত্র পথ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত