খাগড়াছড়ির ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে সেনাবাহিনী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ২৫ বার
খাগড়াছড়ির ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে সেনাবাহিনী: পুনর্বাসনে আর্থিক সহায়তা ও আশ্বাস

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের পাহাড়ি জনপদ খাগড়াছড়ি আবারও সহিংসতা ও অগ্নিসন্ত্রাসের ঘটনায় কেঁপে উঠেছে। সম্প্রতি জেলার গুইমারা উপজেলার রামসু বাজার এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের লাগানো আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হন বহু পরিবার। এ ঘটনায় জনজীবনে তৈরি হয় গভীর ক্ষত এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর উপর নেমে আসে অসহনীয় দুর্দশা। ঠিক এমন সংকটময় পরিস্থিতিতেই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে সেনারা শুধু নিরাপত্তাই জোরদার করেনি, বরং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে আর্থিক সহায়তার হাতও বাড়িয়ে দিয়েছে।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর গুইমারা রিজিয়নের কমান্ডার ঘটনাস্থল রামসু বাজার পরিদর্শন করেন। তিনি বাজার এলাকা ঘুরে দেখেন এবং অগ্নিসন্ত্রাসে ক্ষতিগ্রস্ত দোকানপাট ও বাড়িঘরের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। এরপর তিনি মারমা সম্প্রদায়সহ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃস্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। আলোচনা সভায় তিনি স্থানীয়দের আশ্বস্ত করে বলেন, সেনাবাহিনী সর্বদা দেশের মানুষের পাশে আছে এবং তাদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে প্রায় ১০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা তুলে দেন।

তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা। তিনি জানান, জিওসি ২৪ পদাতিক ডিভিশন এবং এরিয়া কমান্ডার, চট্টগ্রাম এরিয়ার পক্ষ থেকে শিগগিরই আরও ২০ লাখ টাকা অনুদান ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিতরণ করা হবে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ধীরে ধীরে হলেও পুনর্বাসনের প্রক্রিয়ায় নতুন সম্ভাবনার মুখ দেখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

রিজিয়ন কমান্ডার এ সময় স্থানীয়দের উদ্দেশ্যে বলেন, শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখাই পাহাড়ের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। তিনি মানুষকে অপপ্রচার ও স্বার্থান্বেষী মহল দ্বারা প্রভাবিত না হতে আহ্বান জানান। একই সঙ্গে রামসু বাজারে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, বিভক্তি বা বিদ্বেষ নয়, বরং পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থার মাধ্যমেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করা সম্ভব।

এই সহায়তা কার্যক্রম কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং পাহাড়ি অঞ্চলে সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিনের জনবান্ধব ভূমিকাকেই আবারও দৃশ্যমান করেছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সংঘাত কিংবা অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে পাহাড়ি জনপদে সেনাবাহিনী প্রায়শই মানবিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। এ কারণে পাহাড়ের অনেক মানুষ সেনাবাহিনীকে শুধু প্রতিরক্ষা বাহিনী হিসেবেই নয়, বরং একটি মানবিক শক্তি হিসেবেও বিবেচনা করে থাকেন।

খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী প্রায়শই নানা ধরনের অস্থিরতা ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের মুখোমুখি হয়। বিশেষ করে ভূমি বিরোধ, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দ্বন্দ্বের কারণে বহুবার অগ্নিসন্ত্রাস ও নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের জীবনমান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জীবিকা নির্বাহের জন্য বাজার, দোকানপাট, কৃষিজমি কিংবা ঘরবাড়ি হারিয়ে বহু পরিবার অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়ে।

এই বাস্তবতায় সেনাবাহিনীর আর্থিক সহায়তা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য এক ধরনের আশার আলো হয়ে এসেছে। যদিও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি, তবুও প্রাথমিক সহায়তা প্রাপ্তির ফলে ক্ষতিগ্রস্তরা অন্তত পুনর্গঠনের প্রাথমিক ধাপে স্বস্তি ফিরে পাচ্ছে। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর প্রতিশ্রুতি—এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে—ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

এদিকে স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, আগুনে বহু দোকানপাট ভস্মীভূত হয়েছে এবং সাধারণ ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাদের অনেকেই বলেন, সেনাবাহিনীর এই সহায়তা তাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল, কারণ তাদের পুঁজির বড় অংশ আগুনে শেষ হয়ে গেছে। এখন এই আর্থিক সহায়তা কাজে লাগিয়ে তারা পুনরায় ব্যবসা শুরু করতে পারবেন।

রামসু বাজারের মতো পাহাড়ি জনপদে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত। এখানে একটি বাজারই অনেক মানুষের জীবন-জীবিকার কেন্দ্রবিন্দু। সেই বাজারে অগ্নিসন্ত্রাস কেবল একটি অর্থনৈতিক আঘাতই নয়, বরং স্থানীয় জনগণের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে পাহাড়ের আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য এ ধরনের আঘাত দ্বিগুণ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, কারণ তারা একদিকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, অন্যদিকে সামাজিকভাবে ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে বসবাস করে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সহায়তা কার্যক্রম কেবল ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক পুনর্বাসন নয়, বরং পাহাড়ি এলাকায় সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থার সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করবে। গত কয়েক দশকে সেনাবাহিনী পাহাড়ে সন্ত্রাস দমন, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি জনসেবামূলক নানা কার্যক্রমে যুক্ত থেকেছে। ফলে সাধারণ মানুষ মনে করেন, সেনাবাহিনী তাদের নির্ভরযোগ্য সহযোগী।

সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বানও এ সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে। পাহাড়ি অঞ্চলে নানা ধরনের গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়লে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয়, যা কেবল স্থানীয় জনগণকেই নয়, বরং গোটা দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া এই সতর্কবার্তাকে তাই বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন পর্যবেক্ষকরা।

অন্যদিকে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, সরকারের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর এই মানবিক উদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্তদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য টেকসই পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ জরুরি। শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক অনুদান নয়, বরং বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করলেই ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী সত্যিকার অর্থে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, রামসু বাজারে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের লাগানো আগুনে সৃষ্ট ক্ষতির বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর এই মানবিক উদ্যোগ শুধু ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা প্রদান নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য একটি বার্তা। সেটি হলো—বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কেবল একটি প্রতিরক্ষা বাহিনী নয়, বরং দেশের মানুষের দুঃসময়ের সঙ্গী। তাদের এই দায়িত্বশীল ভূমিকা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মনে আস্থা জাগাবে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে সাহায্য করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত