ইসির বিরুদ্ধে ‘স্বেচ্ছাচারিতার’ অভিযোগ তুলে যা বললেন সারজিস

নিজস্ব সংবাদদাতা
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৭ বার
“আমরা শাপলা চেয়েছি, শাপলা আমাদের দিতে হবে'' আদায় করে নিবো -সারজিস আলম

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে আবারও নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম কমিশনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ তুলে বলেছেন, আইনগত কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে ‘শাপলা প্রতীক’ না দিয়ে ইসি এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা করছে। তার দাবি, একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কমিশনের এ ধরনের আচরণ শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি বৈষম্য তৈরি করছে না, বরং একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

শুক্রবার রাতে ঠাকুরগাঁও জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে আয়োজিত মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সারজিস আলম এসব মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, শাপলা প্রতীক দীর্ঘদিন ধরে এনসিপির রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতীক হয়ে আছে। এই প্রতীক সাধারণ জনগণের মধ্যে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য একটি প্রতীক হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। আইনগত কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকা সত্ত্বেও সেটি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের স্বেচ্ছাচারিতার স্পষ্ট উদাহরণ। একটি দলকে এভাবে বঞ্চিত করার মাধ্যমে কমিশন কেবল এনসিপিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকেই অবিশ্বাস্য করে তুলছে।

সারজিসের অভিযোগের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতীকের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এটি শুধু একটি চিহ্ন নয়, বরং একটি রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ, নীতি ও জনগণের কাছে পরিচিতির মাধ্যম। ভোটাররা মূলত প্রতীকের মাধ্যমেই প্রার্থী ও দলকে চিনে নেয়। তাই প্রতীক না দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত কোনো দলের কাছে শুধু রাজনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং জনগণের আস্থার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শাপলা প্রতীককে ঘিরে এনসিপির দাবিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন সংবিধান অনুযায়ী একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হলেও বিগত কয়েক দশক ধরে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। প্রার্থিতা বাতিল, ভোট পরিচালনা, প্রশাসনিক পদক্ষেপ কিংবা প্রতীকের বণ্টন—সবকিছু নিয়েই বিভিন্ন সময়ে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। দেশের কয়েকটি বড় নির্বাচন ঘিরে এই বিতর্ক তীব্র আকার নিয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বহুবার কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ তুলেছে। সারজিস আলমের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই দীর্ঘদিনের বিতর্ককেই নতুন মাত্রা দিয়েছে।

সারজিস আরও বলেন, “আমরা প্রতীক নিয়ে কোনো অন্যায় দাবি করছি না। আমাদের সাংগঠনিক প্রক্রিয়া ও আইনগত অবস্থান সবদিক থেকেই আমরা বৈধ দাবিদার। নির্বাচন কমিশন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈষম্য করবে—এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কাম্য নয়। আমরা আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আইনগত লড়াই চালিয়ে যাব এবং প্রয়োজনে রাজনৈতিকভাবেও এই বিষয়টির মোকাবিলা করব।” তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, প্রতীকের প্রশ্নে এনসিপি আপস করতে নারাজ।

এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, শাপলা প্রতীক না দেওয়া হলে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রতীক ছাড়াই নির্বাচনী মাঠে নামতে হলে দলকে নতুন করে পরিচিতি গড়ে তুলতে হবে, যা তাদের মতে সময়সাপেক্ষ এবং সাংগঠনিকভাবে ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ কারণে তারা এই ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে সামনে এনেছে।

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে কমিশনের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, প্রতীক বণ্টন একটি জটিল প্রক্রিয়া এবং আইন ও বিধিমালার আলোকে তা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। তবুও ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন এবং সারজিস আলমের অভিযোগে কমিশনের ওপর চাপ বাড়বে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে একাধিক নির্বাচনে ইসির সিদ্ধান্ত, ভূমিকা ও কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের প্রতি ঘনিষ্ঠতা কিংবা বিরোধী দলের প্রতি অবিচারের অভিযোগ প্রায় নিয়মিতভাবেই ওঠে আসে। বিশেষ করে সাধারণ নির্বাচনের সময় এই অভিযোগগুলো নতুন করে তীব্র হয়ে ওঠে।

সারজিস আলমের বক্তব্যে আবারও স্পষ্ট হলো যে, দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া এখনও আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি। প্রতীকের মতো মৌলিক একটি বিষয়ে যখন অভিযোগ ওঠে, তখন পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সুদৃঢ় করতে হলে কমিশনের কার্যক্রমের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে জরুরি। কিন্তু একের পর এক বিতর্ক ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ সেই প্রক্রিয়াকে আরও দুর্বল করছে।

সারজিসের এই অভিযোগ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। প্রতীকের ইস্যুকে সামনে রেখে এনসিপি হয়তো তাদের সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেবে। একইসঙ্গে বিরোধী দলের একটি অংশ কমিশনের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য এই ইস্যুকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনও সম্ভবত চাপের মুখে পড়বে, কারণ এ ধরনের অভিযোগ তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। কিন্তু সারজিস আলমের বক্তব্য প্রমাণ করে, বর্তমান বাস্তবতায় সেই আস্থা এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শাপলা প্রতীকের প্রশ্ন শুধু একটি রাজনৈতিক দলের দাবিই নয়, বরং তা গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত