রাজশাহীতে উন্নয়নের নামে ২ হাজার ৩২৩ গাছ নিধন: পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৬ বার
রাজশাহীতে উন্নয়নের নামে ২ হাজার ৩২৩ গাছ নিধন: পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

রাজশাহী শহরকে ঘিরে একদিকে যখন বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে, অন্যদিকে প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর তার ভয়াবহ প্রভাব নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে রাজশাহীতে ২ হাজার ৩২৩টি গাছ কাটা হচ্ছে। এর ফলে একদিকে শহরের সবুজ বেষ্টনী ভেঙে পড়ছে, অন্যদিকে তীব্র গরমে অতিষ্ঠ নগরবাসীর জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো ইতিমধ্যেই বলেছে, উন্নয়নের নামে নির্বিচারে গাছ কেটে কিংবা জলাধার ভরাট করে কোনো প্রকল্প তারা মেনে নেবে না। এ কারণে আন্দোলন, স্মারকলিপি ও প্রতিবাদের প্রস্তুতি চলছে।

শহরের তিনটি বড় প্রকল্পে যে বিপুল সংখ্যক গাছ কাটা হচ্ছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের জন্য। সিলিন্দা ডাবতলা এলাকায় এই প্রকল্পে মোট ১ হাজার ৮৫৩টি গাছ কেটে ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যেই কিছু গাছ কেটে ফেলা হয়েছে, বাকিগুলোর কপালেও একই পরিণতি অপেক্ষা করছে। অপরদিকে রাজশাহী ওয়াসা পদ্মা নদী থেকে পানি পরিশোধনাগার প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যেখানে নতুন ২৬ কিলোমিটার পাইপলাইন বসাতে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের জায়গায় ৪১৮টি গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। এর মধ্যে ৩০৬টি গাছ ইতিমধ্যেই কেটে সওজে সংরক্ষণ করা হয়েছে, আরও ১১২টি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে নিলামের আগে। বর্তমানে চলমান কাজের মধ্যে রয়েছে ৮৪টি গাছ কাটা। তৃতীয় প্রকল্প হিসেবে রাজশাহী সার্কিট হাউস সম্প্রসারণে আরও ৫২টি গাছ কাটা হবে, যেখানে ছয়তলা ভবন, চারতলা ব্যারাক ও একতলা কিচেন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, শহরের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও অপ্রতুল সবুজায়নের কারণে রাজশাহীর আবহাওয়া এখনই মারাত্মক পরিবর্তনের শিকার। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা চরমে ওঠে এবং শীতকালে আর্দ্রতা কমে যায়। এর মধ্যে যদি হাজার হাজার গাছ নির্বিচারে কেটে ফেলা হয়, তবে শহরের তাপমাত্রা আরও বেড়ে যাবে, বায়ুদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করবে এবং প্রাণিকুলের আশ্রয়স্থল বিলীন হয়ে যাবে। ইয়ুথ ফোরামের সদস্য সচিব ও সবুজ সংহতির কর্মী আতিকুর রহমান বলেন, “রাজশাহীর চরম আবহাওয়াকে স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজন সবুজ বেষ্টনী ও পর্যাপ্ত জলাধার। অথচ উন্নয়নের নামে একের পর এক প্রকল্পে গাছ কাটা হচ্ছে এবং প্রকৃতি ধ্বংস করা হচ্ছে। এটি কেবল পরিবেশ নয়, মানুষের জীবন-জীবিকার জন্যও হুমকি।”

স্থানীয় বাসিন্দারাও তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রাজশাহী নগরীর সচেতন নাগরিক এমএ কাইউম বলেন, “গোদাগাড়ি সড়কের পাশে গাছের সারি পথচারী ও ভ্রমণকারীদের জন্য ছিল এক ধরনের স্বস্তি। গাছের ছায়ায় মানুষ যেমন আরাম পেত, তেমনি প্রকৃতিও একটি ভারসাম্য বজায় রাখত। এখন সব গাছ কেটে ফেলার কারণে সড়ক নির্জন ও রুক্ষ হয়ে পড়ছে। এটি মোটেও ইতিবাচক উন্নয়ন নয়।”

প্রকল্প বাস্তবায়নকারীদের পক্ষ থেকে অবশ্য ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। সওজ বিভাগের নির্বাহী বৃক্ষপালনবিদ মীর মুকুট মো. আবু সাঈদ বলেছেন, জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণে পাইপলাইন বসাতে গাছ কাটতেই হচ্ছে। তবে তার দাবি, সব গাছ কাটা হচ্ছে না, এখনো ২২২টি গাছ রক্ষার সুযোগ আছে। অন্যদিকে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হক জানিয়েছেন, অবৈধভাবে গাছ কাটার বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তার দাবি, ক্যাম্পাস স্থাপন দ্রুত করতে কিছু গাছ কাটা অনিবার্য হলেও ৪৯ শতাংশ এলাকা গ্রিন জোন হিসেবে রাখা হবে এবং দ্বিগুণ সংখ্যক নতুন গাছ রোপণ করা হবে।

এমন আশ্বাস সত্ত্বেও পরিবেশবাদীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, কাগজে কলমে গাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবে খুব কমই পূরণ হয়। তারা মনে করেন, একটি পূর্ণবয়স্ক গাছের বিকল্প কখনোই তাৎক্ষণিকভাবে রোপণ করা চারাগাছ হতে পারে না। গাছ কাটার কারণে যে পরিবেশগত ক্ষতি হয়, তা পূরণ হতে কয়েক দশক সময় লাগে।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো সম্প্রতি এক বৈঠক করেছে, যেখানে গবেষক, পরিবেশকর্মী ও আইনজীবীরা অংশ নেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, প্রকল্পের নামে সহস্রাধিক গাছ কাটা বন্ধ করতে প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হবে। একইসাথে জনগণকে সচেতন করতে আন্দোলন ও প্রতিবাদের ডাক দেওয়া হবে। সংগঠনগুলোর দাবি, উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংসের এই ধারা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং বিকল্প পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।

রাজশাহীর বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, শহর উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। শহরের নাগরিক, গবেষক, পরিবেশকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা একমত যে প্রকল্প প্রয়োজনীয় হলেও তা যেন প্রাণ-প্রকৃতিকে ধ্বংস করে না হয়। কেননা রাজশাহী যেমন দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, তেমনি প্রকৃতির সঙ্গে এর মানুষের জীবনযাত্রা গভীরভাবে জড়িত। যদি এই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়, তবে অচিরেই রাজশাহী হবে তপ্ত ও শ্বাসরুদ্ধ নগরী।

অতএব, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে গাছ কাটা যে পরিবেশের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনছে তা এখনই উপলব্ধি করা জরুরি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে হলে পরিকল্পিত উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত