প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা,একটি বাংলাদেশ অনলাইন
মাউন্ট এভারেস্টের তিব্বত অংশে তুষারঝড়ের কারণে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। অন্তত এক হাজার অভিযাত্রী এ দুর্যোগে আটকা পড়েছেন বলে স্থানীয় প্রশাসন নিশ্চিত করেছে। ইতিমধ্যে ৩৫০ জনেরও বেশি অভিযাত্রীকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তবে এখনো বিপুল সংখ্যক মানুষ সেখানে আটকা রয়েছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ঘটনা শুধু অভিযাত্রী নয়, স্থানীয় গাইড ও সহায়তাকারীদের জীবনকেও বিপন্ন করে তুলেছে। যদিও ঠিক কতজন স্থানীয় কর্মী আটকা পড়েছেন সে বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য মেলেনি।
রোববার যাদের উদ্ধার করা হয়েছে, তাদের তিব্বতের দিকের ছোট শহর কুদাংয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন (সিসিটিভি) জানিয়েছে, স্থানীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে উদ্ধারকর্মীদের একাধিক দল ধাপে ধাপে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। তবে তারা স্পষ্ট করেনি, ট্রেকিং পার্টিগুলোর সঙ্গে থাকা গাইড ও সহায়তাকারীরা এই হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত কিনা। একইসঙ্গে এভারেস্টের উত্তর মুখে অবস্থান করা অভিযাত্রীরা কীভাবে প্রভাবিত হয়েছেন, তা এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
তুষারঝড়ে আটকা পড়া অভিযাত্রীদের মধ্যে একজন, চেন গেশুয়াং, তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে জানান, পরিবেশ এতটাই ঠান্ডা এবং ভেজা হয়ে পড়েছিল যে হাইপোথারমিয়ার আশঙ্কা বাড়তে থাকে। তিনি বলেন, তাদের গাইড স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, অক্টোবর মাসে তিনি এর আগে কখনো এমন ভয়াবহ আবহাওয়ার সম্মুখীন হননি। সবকিছু এত দ্রুত ঘটে গিয়েছিল যে অভিযাত্রীদের মধ্যে কেউই সেভাবে প্রস্তুত থাকতে পারেননি।
শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া তুষারপাত টানা শনিবার পর্যন্ত চলতে থাকে। এর ফলে পর্বতপথে পরিস্থিতি মুহূর্তেই ভয়াবহ রূপ নেয়। রাস্তাঘাট ও ট্রেইলগুলো বরফে ঢাকা পড়ে যাওয়ায় চলাচল সম্পূর্ণ অচল হয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার সন্ধ্যা থেকে এভারেস্টের পুরো পর্যটন এলাকা বন্ধ ঘোষণা করে স্থানীয় প্রশাসন।
এমন পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেক অভিযাত্রী গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ ঠান্ডাজনিত অসুস্থতায় ভুগছেন। ইতিমধ্যে উদ্ধার হওয়া কয়েকজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে আটকা পড়া অন্যদের মধ্যে কতজন অসুস্থ বা আহত, তার নির্দিষ্ট সংখ্যা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
এভারেস্ট অঞ্চলে তুষারঝড় নতুন কিছু নয়, তবে এবারের তুষারপাতের মাত্রা বিশেষজ্ঞদের মতে অস্বাভাবিক। পর্বতগবেষকরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয় অঞ্চলে আবহাওয়ার ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, যার ফলে তুষারঝড়ের মতো দুর্যোগ আরও ঘন ঘন ও অপ্রত্যাশিতভাবে ঘটছে। তারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, যদি পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকে তবে ভবিষ্যতে অভিযাত্রীদের জীবন ঝুঁকি আরও বাড়বে এবং এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করা অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।
তিব্বতের স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, আটকে পড়া অভিযাত্রীদের উদ্ধারে চায়না মাউন্টেন রেসকিউ টিম, সেনা সদস্য ও পুলিশ একসাথে কাজ করছে। তীব্র ঠান্ডা ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকাজ ধীরগতিতে চলছে। এছাড়া হেলিকপ্টারের মাধ্যমে উদ্ধারকাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে কারণ ঝড়ো হাওয়া ও ঘন কুয়াশায় উড়োজাহাজ পরিচালনা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পায়ে হেঁটে বা ট্রলির মাধ্যমে আহত ও অসুস্থদের নামিয়ে আনা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, এই দুর্ঘটনা কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি হিমালয় অঞ্চলে ট্রেকিং ও অভিযানের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এভারেস্টসহ হিমালয়ের বিভিন্ন শৃঙ্গ প্রতি বছর হাজারো অভিযাত্রীকে আকর্ষণ করে, যা স্থানীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা, আবহাওয়ার অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন এবং পর্যাপ্ত সতর্কীকরণের অভাব এ ধরনের বিপর্যয়কে আরও জটিল করে তুলছে।
চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশনের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্থানীয় প্রশাসন এবং পর্যটন দপ্তর এরই মধ্যে বিদেশি দূতাবাসগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বেশ কয়েকজন অভিযাত্রী এ ঘটনায় আটকা পড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিটি দেশের দূতাবাস তাদের নাগরিকদের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছে।
উদ্ধারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এভারেস্ট অঞ্চলে সব ধরনের পর্যটন ও অভিযান কার্যক্রম স্থগিত থাকবে বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় সরকার। এ সিদ্ধান্তে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটনকেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিপাকে পড়লেও, মানুষের জীবন বাঁচানোই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এই দুর্ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল যে, পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট কেবল অভিযানের জন্য আকর্ষণীয় নয়, বরং অত্যন্ত ভয়াবহ এবং অনিশ্চিত এক এলাকা। প্রতিটি মুহূর্ত সেখানে অভিযাত্রীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে এবং কোনো সতর্কতা ছাড়াই ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক রেসকিউ টিমগুলো এখন একযোগে চেষ্টা করছে আটকে পড়া সকলকে জীবিত উদ্ধার করার জন্য।