প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অমর নক্ষত্র হুমায়ূন আহমেদকে ঘিরে ফের শুরু হয়েছে এক সামাজিক বিতর্ক। প্রয়াত এই কথাসাহিত্যিকের প্রাক্তন স্ত্রী গুলতেকিন খান সম্প্রতি নিজের ফেসবুক পেজে একটি আবেগঘন পোস্ট দেন, যা ঘিরে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কেউ বলছেন, এটি একজন নারী ও মায়ের দীর্ঘদিনের না বলা যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ, আবার কেউ এটিকে প্রয়াত এক মহান লেখকের প্রতি অসম্মান হিসেবেও দেখছেন। সমালোচনার এই দুই মেরুর মধ্যে এবার কথা বলেছেন হুমায়ূন আহমেদ ও গুলতেকিন খানের পুত্র, তরুণ নির্মাতা নুহাশ হুমায়ূন।
গুলতেকিন খানের পোস্টটি মূলত তার অতীত জীবনের এক অনুচ্চারিত অধ্যায় নিয়ে। পোস্টে তিনি কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করলেও, লেখার ভঙ্গি ও আবেগে অনেকেই বুঝে নিয়েছেন, তিনি প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদকে উদ্দেশ্য করেই কথা বলেছেন। সেখানে গুলতেকিন লিখেছেন, “কখনো কখনো মানুষ এতটা প্রিয় হয় যে, তার অন্যায়কেও আমরা অন্যভাবে দেখি। কিন্তু প্রিয়জনের হাতে ক্ষতও যেমন গভীর হয়, তেমনি তার নীরবতাও দীর্ঘ হয়।”
পোস্টটি প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় তুমুল প্রতিক্রিয়া। হুমায়ূন আহমেদের অনুরাগীরা মন্তব্যের বন্যা বইয়ে দেন—কেউ গুলতেকিনের প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, কেউ আবার লিখেছেন, “যে মানুষটি বাংলা সাহিত্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তার নামে এভাবে কিছু বলা উচিত নয়।” অন্যদিকে, গুলতেকিনের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে অনেকেই বলেছেন, “একজন নারীর কষ্টের কথা বলা অপরাধ নয়, বিশেষ করে যখন সেটি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ব্যথা।”
দু’পক্ষের এই তীব্র বিতর্কের মাঝেই শনিবার সন্ধ্যায় নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে লেখকপুত্র নুহাশ হুমায়ূন একটি পোস্ট দেন, যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে পড়ে। নুহাশ লেখেন, “কোনো শিল্পী বা সৃষ্টিশীল মানুষকে তার কাজের জন্য ভালোবাসা যায়। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, তার ব্যক্তিজীবনে ঝামেলা থাকতে পারে। বাস্তবতা হিসেবে দুটোই একসঙ্গে সত্য হতে পারে। মানুষ জটিল এবং ভুলপ্রবণ—যেমনটা আমরা আমাদের প্রিয় গল্পগুলোর চরিত্রে দেখি।”
নুহাশের বক্তব্যে এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে, যা অনেক পাঠকের প্রশংসা কুড়িয়েছে। তিনি আরও লিখেছেন, “কেউ কেউ কোটি মানুষকে আনন্দ দেয়, অথচ খুব কাছের কাউকে কষ্ট দেয়। এর মানে এই নয় যে, যে কষ্ট পেয়েছে সে চুপ থাকবে। তবে এটাও নয় যে, যে মরে গেছে তাকে অসম্মান করা হবে।”
তার এই পোস্ট যেন চলমান বিতর্কে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কেউ কেউ বলছেন, নুহাশ পরিণত ও সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিষয়টিকে প্রশমিত করার চেষ্টা করেছেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এই বক্তব্যে তিনি একই সঙ্গে উভয় পক্ষের আবেগকেও সম্মান জানিয়েছেন।
এদিকে, গুলতেকিন খানের লেখাটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে এখনো চলছে ব্যাপক আলোচনা। অনেকেই তার পুরনো সাক্ষাৎকার, বিবাহ-বিচ্ছেদ পরবর্তী সময়ের অভিজ্ঞতা এবং হুমায়ূন আহমেদের জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছেন। কেউ কেউ বলছেন, “হুমায়ূন আহমেদ যেমন ছিলেন অসাধারণ লেখক, তেমনি একজন জটিল মানুষও ছিলেন।” অন্যদিকে, তার ভক্তদের অনেকেই মন্তব্য করছেন, “মানুষ হিসেবে তিনি যাই হোন, বাংলা সাহিত্য তার কাছে চিরঋণী থাকবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্কের মূল কারণ হুমায়ূন আহমেদের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও মানুষের আবেগের গভীর সংযোগ। তার লেখনী, নাটক, চলচ্চিত্র—সবই তাকে সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ করে তুলেছিল। ফলে তাকে নিয়ে যে কোনো সমালোচনাই জনমনে প্রবল আলোড়ন তোলে।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন এক অনন্য অধ্যায়। ‘নন্দিত নরকে’ থেকে শুরু করে ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’ কিংবা ‘কোথাও কেউ নেই’—তার সৃষ্টির জগৎ এতটাই বিস্তৃত যে, তার নাম উচ্চারণেই অনেকের চোখে nostalgia ভেসে ওঠে। তার চরিত্রগুলো—হিমু, মিসির আলি কিংবা বেকার যুবক শুভ্র—এখনও পাঠকের জীবনের অংশ।
সাহিত্য সমালোচকরা বলছেন, গুলতেকিনের পোস্টটি সম্ভবত ব্যক্তিগত অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ, কিন্তু তা হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তা ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের কারণে একটি বৃহত্তর জনআলোচনায় পরিণত হয়েছে। একজন বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, “বাংলাদেশে হুমায়ূন আহমেদ কেবল একজন লেখক নন, তিনি একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক। তাই তাকে ঘিরে আবেগও বহুগুণে বেড়ে যায়। তার জীবনের প্রতিটি দিক মানুষ গভীরভাবে অনুসরণ করেছে, ফলে কোনো মন্তব্যই এখানে সাধারণ থাকে না।”
অন্যদিকে, গুলতেকিন খান দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত আছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি সাহিত্য, নারী অধিকার ও সামাজিক প্রশ্ন নিয়ে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে লিখছেন। তার ভাষায়, “লেখা আমার জন্য শুধু প্রকাশ নয়, এটি আত্মশুদ্ধিরও একটি মাধ্যম।”
এদিকে, নুহাশ হুমায়ূন নিজেও এখন দেশের অন্যতম আলোচিত তরুণ নির্মাতা। তার পরিচালিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র “মশারি” আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে, এবং তিনি এখন একাধিক নতুন প্রজেক্টে কাজ করছেন। ফলে তার প্রতিটি বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া মিডিয়ার নজরে থাকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ব্যবহারকারী নুহাশের পোস্টে মন্তব্য করেছেন, “তোমার পরিণত দৃষ্টিভঙ্গি হুমায়ূন আহমেদের উত্তরাধিকারীর মতোই প্রজ্ঞাপূর্ণ।” অন্য কেউ লিখেছেন, “তুমি তোমার বাবা ও মায়ের প্রতি সমান শ্রদ্ধা দেখিয়েছ, এটাই সবচেয়ে মানবিক।”
তবে বিতর্ক থেমে নেই। হুমায়ূন অনুরাগীদের একাংশ এখনো গুলতেকিনের পোস্টের নিন্দা জানিয়ে লিখছেন, “যে মানুষ আজ আর নেই, তাকে নিয়ে এমন মন্তব্য করা মানে তার উত্তরাধিকারের প্রতি আঘাত।” বিপরীতে, গুলতেকিনের সমর্থকেরা লিখছেন, “একজন নারী যখন কষ্টের কথা বলে, তখন সেটি কোনো অসম্মান নয়, বরং নিজের সত্য প্রকাশ।”
সব মিলিয়ে, এই বিতর্ক আবারও প্রমাণ করল—হুমায়ূন আহমেদ কেবল একজন লেখক নন, তিনি বাঙালির আবেগ, স্মৃতি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়, এমনকি মৃত্যুর পরও, মানুষকে আলোড়িত করে। হয়তো এটাই এক প্রকৃত শিল্পীর পরিচয়—যার গল্প শেষ হলেও, আলোচনার ধারা কখনো থামে না।
বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে এখনো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—একজন লেখকের ব্যক্তিজীবন কি তার সৃষ্টিশীলতার মূল্যায়নে প্রভাব ফেলা উচিত? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো সময়ই দেবে। কিন্তু আপাতত যা স্পষ্ট, তা হলো—হুমায়ূন আহমেদ এখনো জীবন্ত, তার চরিত্রগুলোর মতোই মানুষের মনে, আলোচনায়, এবং ভালোবাসায়।