ফিজিওলজি বা মেডিসিনে নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৩ বার
ফিজিওলজি বা মেডিসিনে নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

মানবদেহের ইমিউন সিস্টেম বা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা একদিকে যেমন জীবনের রক্ষাকবচ, অন্যদিকে সেটি যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে নিজের শরীরকেই আক্রমণ করতে পারে। সেই জটিল ভারসাম্যের রহস্য উদঘাটনের জন্য ২০২৫ সালের ফিজিওলজি বা মেডিসিনে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মেরি ই. ব্রানকো, ফ্রেড র‍্যামসডেল এবং শিমন সাকাগুচি। তাঁরা আবিষ্কার করেছেন কীভাবে শরীরের “পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স” বা পার্শ্বিক প্রতিরোধ সহনশীলতা আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে নিজ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি করা থেকে বিরত রাখে।

তাদের এই যুগান্তকারী গবেষণা চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যা অটোইমিউন রোগ, ক্যানসার এবং স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের জটিলতা মোকাবিলায় নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

ইমিউন সিস্টেমকে বিজ্ঞানের এক ‘অলৌকিক বিবর্তন’ বলা হয়। প্রতিদিন অসংখ্য ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীব থেকে দেহকে রক্ষা করে এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা। এর অনুপস্থিতিতে মানুষের বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ত। তবে এই শক্তিশালী ব্যবস্থার মধ্যেই রয়েছে এক জটিল ভারসাম্য—কীভাবে এটি বাহ্যিক শত্রুদের শনাক্ত করে, আবার নিজের শরীরকে রক্ষা করে? কেন এটি নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আক্রমণ করে না?

দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন, এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে “সেন্ট্রাল ইমিউন টলারেন্স” নামক প্রক্রিয়ায়—যেখানে প্রতিরোধ কোষগুলো পরিপক্ব হয় ও শরীরের নিজের কোষকে আক্রমণ না করার নির্দেশ শেখে। কিন্তু পরবর্তী গবেষণায় দেখা যায়, মানব ইমিউন সিস্টেম আরও অনেক জটিল এবং গভীরভাবে নিয়ন্ত্রিত।

এই জায়গাতেই যুগান্তকারী অবদান রাখেন ব্রানকো, র‍্যামসডেল ও সাকাগুচি। তাঁরা আবিষ্কার করেন, ইমিউন সিস্টেমের “রেগুলেটরি টি-সেল” নামক বিশেষ কোষগুচ্ছ দেহের অভ্যন্তরে এক ধরনের “নিরাপত্তারক্ষী” হিসেবে কাজ করে—যা নিশ্চিত করে যে, ইমিউন সিস্টেম নিজের টিস্যুকে শত্রু হিসেবে ভুল না করে। তাঁদের এই আবিষ্কার শুধু রোগপ্রতিরোধবিজ্ঞানের ধারণা বদলে দেয়নি, বরং চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন এক শাখার সূচনা করেছে।

নোবেল কমিটির ভাষ্যমতে, এই তিন বিজ্ঞানীর আবিষ্কার বর্তমানে ক্যানসার, অটোইমিউন রোগ এবং স্টেম সেল প্রতিস্থাপনজনিত জটিলতা প্রতিরোধে নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবনের পথ খুলে দিয়েছে। এসব চিকিৎসা এখন বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে মূল্যায়িত হচ্ছে।

১৯৯০-এর দশকে ইমিউন সিস্টেম নিয়ে যে ধারণা বিজ্ঞানীদের ছিল, তা তুলনামূলক সরল। তারা জানতেন, টি-সেল নামের বিশেষ কোষগুলো শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার কেন্দ্রে অবস্থান করে। হেলপার টি-সেল নিয়মিতভাবে শরীরের বিভিন্ন স্থানে টহল দেয় এবং কোনো জীবাণু আক্রমণ করলে অন্যান্য প্রতিরোধ কোষকে সতর্ক করে দেয়। অন্যদিকে, কিলার টি-সেল ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত কোষ অথবা ক্যানসার কোষকে ধ্বংস করে।

এই টি-সেলগুলোর বিশেষত্ব তাদের গঠনেই লুকিয়ে আছে। প্রতিটি টি-সেলের পৃষ্ঠে “টি-সেল রিসেপ্টর” নামের এক ধরনের প্রোটিন থাকে, যা সংবেদক বা সেন্সরের মতো কাজ করে। এগুলো শরীরের কোষগুলো স্ক্যান করে বোঝে দেহ আক্রান্ত কিনা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই রিসেপ্টরগুলোর প্রতিটির গঠন আলাদা, যেন পাজলের টুকরোর মতো। বিভিন্ন জিনের সমন্বয়ে গঠিত এই রিসেপ্টরগুলোর বৈচিত্র্য এমন যে, মানবদেহে প্রায় এক কোয়াড্রিলিয়ন (১০¹⁵) পর্যন্ত ভিন্ন ধরনের রিসেপ্টর তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।

এই বিপুল বৈচিত্র্যের কারণেই ইমিউন সিস্টেম প্রতিদিন অসংখ্য অজানা জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এখানেই ঝুঁকিও রয়েছে—যদি কোনো টি-সেল ভুলবশত নিজের কোষকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে, তবে তা ভয়াবহ অটোইমিউন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

এই জায়গাতেই ব্রানকো, র‍্যামসডেল ও সাকাগুচির গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁরা দেখিয়েছেন, রেগুলেটরি টি-সেল বা “টি-রেগ” কোষগুলোই এই ভুল আক্রমণ ঠেকায়। এই কোষগুলো ইমিউন সিস্টেমের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে এবং অপ্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়া বন্ধ রাখে। এভাবে তারা শরীরের “শান্তি রক্ষাকারী বাহিনী” হিসেবে কাজ করে।

তাদের গবেষণা শুধু মৌলিক বিজ্ঞানে নয়, চিকিৎসা প্রযুক্তিতেও বিপ্লব ঘটিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু নতুন ওষুধ তৈরি হচ্ছে যা রেগুলেটরি টি-সেল সক্রিয় করে ক্যানসারের চিকিৎসায় সহায়ক হতে পারে। একইভাবে, অটোইমিউন রোগ যেমন রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, টাইপ-১ ডায়াবেটিস কিংবা মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এই কোষগুলো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নতুন চিকিৎসা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

শুধু তাই নয়, স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের পর দেখা দেওয়া মারাত্মক ইমিউন প্রতিক্রিয়া প্রতিরোধেও এই আবিষ্কার কার্যকর হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা।

নোবেল কমিটি বলেছে, “ব্রানকো, র‍্যামসডেল ও সাকাগুচির কাজের মাধ্যমে আমরা এখন জানি কীভাবে মানবদেহ প্রতিদিন নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করে—শুধু বাহ্যিক শত্রুর কাছ থেকে নয়, নিজের ভেতরের সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকেও।”

তাদের এই যুগান্তকারী গবেষণা বিজ্ঞানজগতে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনেছে—ইমিউন সিস্টেম আর কেবল যুদ্ধযন্ত্র নয়, এটি একই সঙ্গে এক সুবিন্যস্ত ও আত্মনিয়ন্ত্রিত প্রতিরক্ষা কাঠামো। এই উপলব্ধিই হয়তো ভবিষ্যতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত