প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে গাজা থেকে ইসরাইলি সেনাদের ধাপে ধাপে প্রত্যাহার শুরু হয়েছে। স্থানীয় সময় শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে এই প্রত্যাহারের কার্যক্রম শুরু হয়। সেনাদের সরিয়ে নেওয়া শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাজার উত্তরাঞ্চলের দিকে ফিরতে শুরু করেছেন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি নাগরিকরা, যারা দীর্ঘদিন ধরে তাদের বাড়িঘর থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত ছিলেন। গাজার সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, শত শত মানুষ ইতোমধ্যেই গাজা সিটির নিজের বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন, যদিও তাদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা বা বাড়ির ক্ষতি হয়নি কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) জানিয়েছে, প্রত্যাহার চলাকালীন সমস্ত সেনা নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করবেন এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তির রূপরেখা অনুসারে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় থাকবে। তবে সত্ত্বেও, ভোর থেকেই ইসরায়েলি ড্রোন, যুদ্ধবিমান এবং যুদ্ধজাহাজের তৎপরতা বেড়েছে। বিশেষ করে সকালে যেসব এলাকায় মানুষ বাড়ি ফেরার জন্য জড়ো হয়েছিলেন, সেসব এলাকায় হামলার খবর পাওয়া গেছে। গাজার আল-আহলি হাসপাতালে জানা গেছে, সকাল থেকেই গাজা সিটির বিভিন্ন এলাকা থেকে সাতজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
এ কার্যক্রমের প্রেক্ষিতে ইসরাইল সরকার গাজা যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তি সংক্রান্ত চুক্তি অনুমোদন করেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এই চুক্তিতে ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি, ইসরাইলি জিম্মিদের মুক্তি এবং গাজায় যুদ্ধ বন্ধের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এর আগে বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তার প্রদত্ত ২০ ধাপের শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের জন্য হামাস ও ইসরাইল রাজি হয়েছে। যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা পেয়ে গাজায় মানুষ স্বস্তি অনুভব করছেন এবং ইসরাইলে জিম্মিদের পরিবারের সদস্যরা উল্লাস করছেন।
গাজার শান্তি চুক্তির ফলে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হলেও, বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন ও অবকাঠামোর ক্ষতি মেরামতের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাহায্য প্রয়োজন হবে। চুক্তি অনুযায়ী, যেসব এলাকা ইসরাইলি সেনাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেখানে শান্তি বজায় রাখার দায়িত্ব মূলত স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনী এবং জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকদের উপর থাকবে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, প্রত্যাহার শুরু হওয়ার পর থেকেই গাজার স্থানীয় নাগরিকরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন। তবে তারা সচেতন যে, ড্রোন হামলা এবং গোলাবর্ষণের ঝুঁকি এখনও রয়েছে। আশ্রয়প্রাপ্ত পরিবারগুলো তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িঘর পুনঃনির্মাণ এবং জীবিকার জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য আবেদন করেছেন।
গাজার উত্তরাঞ্চলের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন হিউম্যানিটেরিয়ান সংস্থা জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা, খাবার এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, যাতে বাস্তুচ্যুতরা নিরাপদে তাদের পুরনো বাড়িতে ফিরে যেতে পারে।
নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে এর স্থায়িত্বের জন্য উভয় পক্ষের পূর্ণ সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তদারকি অপরিহার্য। সাম্প্রতিক সময়ে গাজার উত্তেজনা এবং সামরিক কর্মকাণ্ড প্রমাণ করেছে যে, শান্তি কেবলই কাগজে নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতায় নিশ্চিত করতে হবে।
এই প্রত্যাহার কার্যক্রম এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এটি কেবল গাজার নাগরিকদের জন্য নয়, সমগ্র অঞ্চলের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
গাজা সিটির নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে যে, তারা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারায় স্বস্তি পাচ্ছেন। তবে তারা জানাচ্ছেন, পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না। স্কুল, হাসপাতাল ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুনরুদ্ধারের কাজ দীর্ঘমেয়াদি।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা এবং তহবিল সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়বে। জাতিসংঘ ও অন্যান্য হিউম্যানিটেরিয়ান সংস্থা ইতিমধ্যেই এ অঞ্চলে সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছে।
সেনাদের প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গে গাজার নাগরিকরা নতুনভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার চেষ্টা করছেন। যুদ্ধবিরতির ফলে তারা পুনরায় ঘর, শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ ফিরে পেতে সক্ষম হবেন। তবে শান্তি এবং নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য রাজনৈতিক এবং সামাজিক সমন্বয় অব্যাহত থাকা জরুরি।
গাজা অঞ্চলে ইসরাইলি সেনাদের প্রত্যাহার এবং যুদ্ধবিরতি কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং পর্যবেক্ষকরা গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করছেন। এই প্রক্রিয়ার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন এবং নাগরিকদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রকাশিত বিশ্লেষণে মনে করা হচ্ছে, গাজার এই শান্তি পদক্ষেপ ভবিষ্যতে উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক সমঝোতা গঠনে সহায়ক হবে। তবে বাস্তবিক চ্যালেঞ্জগুলো এখনও রয়ে গেছে। নিরাপত্তা, পুনর্বাসন, এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তৎপরতা অপরিহার্য।
এই ঘটনা গাজার দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, যা ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য স্বস্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে পারে।