“আমরা আবার ঘর বানাব” গাজায় নীরব প্রতীক্ষা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৭২ বার
গাজায় ফিরছেন জীবনের টানে: যুদ্ধবিরতির পর নতুন আশার আলো

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

গাজায় দীর্ঘ দুই বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, অনাহার ও ধ্বংসযজ্ঞের পর অবশেষে একফোঁটা আশার আলো দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলি সরকারের অনুমোদনের পর নতুন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাজা জুড়ে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা—যেন যুদ্ধের পর ক্লান্ত শহর নিঃশ্বাস নিচ্ছে একটু শান্তির। তবে এই নীরবতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক এবং ধ্বংসের তীব্র বাস্তবতা।

বিধ্বস্ত ভবন, পোড়া ঘরবাড়ি ও ছিন্নমূল মানুষের আর্তনাদে ভরপুর গাজার রাস্তাগুলো এখনো যুদ্ধের স্মৃতি বহন করছে। হাজারো পরিবার যাদের ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, তারা আশ্রয় নিয়েছে সাময়িক ত্রাণকেন্দ্র, স্কুল কিংবা ভাঙা ভবনের ছায়ায়। গাজা সিটি ও খান ইউনুসে এখনো ভিড় জমে আছে বাস্তুচ্যুতদের; নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা দিন গুনছে কবে তারা ফিরতে পারবে নিজেদের ভাঙা ঘরের মাটিতে।

যুদ্ধবিরতির খবর যদিও আশার ঝলক জাগিয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ মানুষের জীবন এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। অনেকেই পরিবার হারানোর শোক থেকে বেরোতে পারছেন না। এক নারী, যিনি নিজের দুই সন্তানকে হারিয়েছেন, বলেন—“শান্তি এলে কী হবে, আমার পৃথিবী তো আগেই ধ্বংস হয়েছে।” তার এই কথাই যেন আজকের গাজার হাজারো মায়ের অনুভূতির প্রতিধ্বনি।

অন্যদিকে, সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েলি সেনাদের আংশিক প্রত্যাহারের খবরও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইসরায়েল-গাজা সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে সাঁজোয়া যান, ট্যাঙ্ক ও সামরিক ট্রাকের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। সৈন্যরা নতুন অবস্থানে মোতায়েন হচ্ছে—এ যেন যুদ্ধবিরতির নেপথ্যে সামরিক কৌশলের আরেক অধ্যায়। সামরিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এই প্রত্যাহার যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী, তবে ইসরায়েলি সেনারা এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে, যেন যুদ্ধবিরতির পরও কোনো অঘটন ঘটলে তারা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।

চুক্তি অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরপরই গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর কথা। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর তত্ত্বাবধানে খাদ্য, পানি, জ্বালানি, ওষুধ এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম বহনকারী সহায়তাবাহী ট্রাকগুলো ইতোমধ্যে সীমান্তে অপেক্ষা করছে। প্রায় ৬০০ ট্রাক প্রথম ধাপে গাজায় প্রবেশের অনুমতি পাবে বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গাজার হাসপাতালে অক্সিজেন, ওষুধ ও বিদ্যুৎ ঘাটতি মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে—তাই দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।

তবুও, এই মানবিক উদ্যোগের মাঝেও ভয় কাটছে না। স্থানীয়রা বলছেন, আকাশে ড্রোনের গুঞ্জন এখনো শোনা যায়, আর প্রত্যেকটি রাতে তারা আতঙ্কে ঘুমান—যেন যুদ্ধের দুঃস্বপ্ন এখনও তাদের ছায়া হয়ে আছে। গাজার আকাশে আজও ধোঁয়া ভাসে, যদিও তাতে বোমার গর্জন নেই, আছে কেবল অনিশ্চয়তার ধোঁয়াশা।

একজন তরুণ শিক্ষক, যিনি তার পরিবার নিয়ে এক বছর ধরে শরণার্থী শিবিরে আছেন, বলেন—“আমাদের ঘর আর বাকি নেই, কিন্তু তবুও ফিরব। কারণ মানুষ ঘর বানাতে পারে, কিন্তু আশ্রয়হীনভাবে বাঁচা যায় না।” তার এই কথাই গাজার জনগণের অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যুদ্ধবিরতি কার্যকরের বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আরব লিগের পক্ষ থেকে উভয় পক্ষকে শান্তি রক্ষায় আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে মানবিক সাহায্য ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয় প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার।

যুদ্ধবিরতির এই ক্ষণিক স্বস্তির মাঝেও অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—এই শান্তি কতটা স্থায়ী হবে? ইতিহাস বলে, গাজায় বহুবার যুদ্ধ থেমেছে, আবার শুরুও হয়েছে। কিন্তু এবার হয়তো মানুষের মন আরও বেশি ক্লান্ত, তাদের আর যুদ্ধ চায় না কেউ। শিশুরা ভাঙা দেয়ালের আড়াল থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, হয়তো মনে মনে প্রার্থনা করছে—যেন আর কোনোদিন বোমা না পড়ে, যেন শান্তির এই আলো সত্যিই স্থায়ী হয়।

গাজা আজ কেবল এক যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল নয়, এটি মানবিক বেদনার প্রতীক। তবুও, ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যে মা সন্তানকে কোলে নিয়ে বলে—“আমরা আবার ঘর বানাব”—তার কণ্ঠেই লুকিয়ে আছে গাজার ভবিষ্যতের আশার বীজ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত