বাংলাদেশে ফিরলেন শহিদুল আলম

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬১ বার
বাংলাদেশে ফিরলেন শহিদুল আলম

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী, মানবাধিকারকর্মী এবং দৃকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল আলম দেশে ফিরেছেন। গাজা অভিমুখী নৌবহর ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা’-তে অংশ নিতে গিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর তাঁর দেশে ফেরাকে ঘিরে সকাল থেকেই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ছিল উত্তেজনা ও প্রত্যাশার মিশেল। শনিবার ভোর ৫টার দিকে তাঁকে বহনকারী বিমানটি ঢাকার মাটিতে অবতরণ করে।

দেশে পৌঁছেই দৃকের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে জানানো হয়, তাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল আলম নিরাপদে দেশে ফিরেছেন। পোস্টটি ছড়িয়ে পড়তেই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুভেচ্ছা ও অভিনন্দনের ঢল নামে। অনেকেই তাঁর সাহসী অবস্থান ও মানবতার পক্ষে নিরলস সংগ্রামের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।

বিমানবন্দরে পৌঁছে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে শহিদুল আলম বলেন, “বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা আমাকে ফিরে আসার সুযোগ করে দিয়েছে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, গাজার মানুষ এখনো মুক্ত হয়নি। তারা এখনো আক্রান্ত, নির্যাতিত। যতদিন গাজার মুক্তি না আসছে, আমাদের কাজ শেষ নয়।” তাঁর কণ্ঠে ছিল দৃঢ় প্রত্যয়, চোখে গভীর ক্লান্তি, কিন্তু মন ভরা আশা।

তিনি আরও বলেন, “সারা পৃথিবী থেকে বাংলাদেশিরা যেভাবে সাড়া দিয়েছেন, দোয়া করেছেন, বাংলাদেশ সরকার এবং টার্কিশ সরকার যেভাবে সাহায্য করেছেন, আমি সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। আমি যেতে পেরেছি, কিন্তু অনেকে পারেননি। আরও হাজার হাজার ফ্লোটিলা প্রয়োজন, যতদিন না ফিলিস্তিন স্বাধীন হয়।”

মানবতার পক্ষে আন্তর্জাতিক এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে শহিদুল আলমের অংশগ্রহণ কেবল একজন আলোকচিত্রী হিসেবে নয়, বরং একজন সংগ্রামী কণ্ঠ হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশকে পুনরায় পরিচিত করিয়েছে। তাঁর কথায় উঠে আসে ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি অবিচল সমর্থন এবং বৈশ্বিক মানবিকতার গভীর আহ্বান।

এর আগে শুক্রবার রাতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে জানানো হয় যে, শনিবার সকালে দেশে ফিরবেন শহিদুল আলম। স্থানীয় সময় শুক্রবার দুপুরে তিনি তুরস্কের ইস্তাম্বুলে পৌঁছালে তাঁকে স্বাগত জানান বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।

উল্লেখযোগ্য যে, ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন’ নামে একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম গাজার জনগণের ওপর চলমান ইসরায়েলি অবরোধ ভাঙতে এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে নৌবহর পাঠানোর উদ্যোগ নেয়। এই অভিযানে যোগ দেয় আরও একটি মানবিক উদ্যোগ, ‘থাউজেন্ড ম্যাডলিনস টু গাজা’। দুই সংস্থার যৌথ অভিযানে মোট ৯টি নৌযান অংশ নেয়, যার প্রতিটিতে ছিল মানবিক কর্মী, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও চিকিৎসকরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি শহিদুল আলম।

গাজার উদ্দেশে যাত্রা শুরুর কয়েক ঘণ্টা পরেই বুধবার নৌবহরটি ইসরায়েলি নৌবাহিনীর হামলার মুখে পড়ে। জোরপূর্বক সব অধিকারকর্মী ও নাবিককে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে জানা যায়, তাঁদের ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলের কুখ্যাত কেৎজিয়েত কারাগারে নেওয়া হয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বহুবার নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছে।

বাংলাদেশ সরকার তখন থেকেই শহিদুল আলমের মুক্তির জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে জর্ডান, মিসর এবং তুরস্কের মাধ্যমে ইসরায়েল সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও বিশ্বজুড়ে কর্মী সমাজ তাঁর মুক্তির দাবিতে আওয়াজ তোলে।

দীর্ঘ কয়েকদিনের অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের পর শুক্রবার শহিদুল আলম মুক্তি পান এবং ইসরায়েল থেকে তুরস্কের উদ্দেশে যাত্রা করেন। এরপর শনিবার সকালে দেশের মাটিতে পা রাখেন তিনি।

দেশে ফেরার পর তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে মানবিক দায়িত্ববোধের কথা। তিনি বলেন, “আমাদের আসল সংগ্রাম এখনো বাকি। ফিলিস্তিন মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন থামবে না।” তাঁর এই বক্তব্য যেন আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়, শিল্পীর দায় কেবল রঙে বা ছবিতে সীমাবদ্ধ নয়—বরং মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোও এক প্রকার শিল্প।

বাংলাদেশে ফিরে তিনি যে স্বস্তি ও আনন্দে আপ্লুত, তা তাঁর হাসিতেই ফুটে উঠেছে। কিন্তু তাঁর চোখে ছিল এক অমোঘ বার্তা—বিশ্বের প্রতিটি অবরুদ্ধ জনগোষ্ঠীর মুক্তির জন্য লড়াই চলবে।

দীর্ঘদিন ধরেই শহিদুল আলম ছিলেন মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার পক্ষে এক উচ্চকণ্ঠ ব্যক্তিত্ব। এবারও তাঁর পদক্ষেপ প্রমাণ করল, মানবতার জন্য লড়াই করতে ভয় পায় না এক বাংলাদেশি আলোকচিত্রী, যিনি ক্যামেরার লেন্স ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক।

বাংলাদেশে তাঁর ফেরাকে ঘিরে অনেকেই বলছেন, এটি কেবল একজন মানুষের ফিরে আসা নয়, বরং মানবতার পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থানকে নতুন করে দৃশ্যমান করার প্রতীকী মুহূর্ত। শহিদুল আলমের দৃঢ় উচ্চারণ যেন বিশ্বকে আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়—“যতক্ষণ না গাজার শিশুরা নিরাপদ, যতক্ষণ না ফিলিস্তিনের আকাশ মুক্ত, ততক্ষণ আমাদের সংগ্রাম শেষ নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত