সড়কপথে সিলেট ভ্রমণের আমন্ত্রণ প্রধান উপদেষ্টাকে আরিফের

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫৫ বার
সড়কপথে সিলেট ভ্রমণের আমন্ত্রণ প্রধান উপদেষ্টাকে আরিফের

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সড়কপথে সিলেট সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী। শুক্রবার বিকেলে নিজের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই আহ্বান জানান।

সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার নাজুক অবস্থা নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, “এখন আর চুপ করে থাকার সময় নয়। সিলেটের জনগণের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্য আজ সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আমি সরকার প্রধানকে অনুরোধ করছি—আপনি অন্তত একবার সড়কপথে সিলেট ভ্রমণ করুন। তবেই বুঝতে পারবেন বাস্তব পরিস্থিতি কত ভয়াবহ।”

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধান দায়িত্ব গ্রহণের পরও সিলেটে আসেননি। এটি এক ধরনের নজির হয়ে থাকবে, কিন্তু এই নজির ইতিবাচক নয়। আমি আশা করি, প্রধান উপদেষ্টা তাঁর উপদেষ্টাদের সঙ্গে নিয়ে অন্তত একবার পূণ্যভূমি সিলেটে আসবেন, ওলিদের দরবারে এসে দোয়া করবেন, আর নিজের চোখে দেখবেন সিলেটবাসীর দুর্ভোগ।”

আরিফুল হক চৌধুরীর বক্তব্যে উঠে আসে গভীর হতাশা ও ক্ষোভের সুর। তিনি বলেন, “বিগত ১৫ থেকে ১৭ বছরের শাসনামলে সিলেটের প্রতি উন্নয়ন বরাদ্দ ছিল অত্যন্ত সীমিত। অথচ সিলেট দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্র, যেখানে প্রবাসী আয় ও পর্যটন অর্থনীতি দেশের রাজস্বে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু সেই সিলেটের রাস্তাঘাট আজ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নাগরিক জীবন যেন এক দুর্ভোগের নাম।”

তিনি জানান, এই বৈষম্যের প্রতিবাদে আগামী রবিবার (১২ অক্টোবর) সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত নগরীর কেন্দ্রীয় স্থান কোর্ট পয়েন্টে এক ঘণ্টার প্রতীকী অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে। কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁরা সরকারের প্রতি সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা সংস্কারের দাবি জানাবেন।

সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দুরবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, “বছরের পর বছর ধরে এই মহাসড়কের কাজ চলছে, কিন্তু কোনো অগ্রগতি নেই। প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা যানজটে আটকে থাকতে হয় যাত্রীদের। সময় নষ্ট হয়, দুর্ঘটনা বাড়ছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাস্তায় পণ্য আনতে দেরি হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে গেছে। অথচ এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।”

আরিফুল হক আরও বলেন, “শুধু সড়ক নয়, রেলপথেও আমরা পিছিয়ে আছি। ট্রেনগুলো পুরনো ও জরাজীর্ণ, সময়মতো আসে না। বিমান ভাড়াও এত বেশি যে সাধারণ মানুষ তা বহন করতে পারে না। সড়ক, রেল ও বিমান—তিনটি পথেই আমরা বৈষম্যের শিকার।”

তিনি অভিযোগ করেন, “বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে সিলেটের উন্নয়ন পরিকল্পনায় কোনো আন্তরিকতা নেই। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কেউ সিলেটে এসে সরেজমিনে দেখেন না মানুষের কষ্ট। সরকারের এই অবহেলা এখন স্পষ্টতই রাজনৈতিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

প্রধান উপদেষ্টার উদ্দেশে সরাসরি আহ্বান জানিয়ে আরিফ বলেন, “আপনি যদি সত্যিই জনগণের কষ্ট জানতে চান, তাহলে হেলিকপ্টারে নয়—সড়কপথে সিলেটে আসুন। কুমিল্লা থেকে শুরু করে হবিগঞ্জ, শায়েস্তাগঞ্জ, ওসমানীনগর হয়ে সিলেটে আসলে আপনি বুঝতে পারবেন সড়কগুলো কতটা বিপর্যস্ত। এতে আপনি কেবল এক অঞ্চলের নয়, পুরো দেশের অবকাঠামোগত বাস্তবতাও বুঝতে পারবেন।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের জনগণ আজ ক্লান্ত। তারা প্রতিদিন এই দুরবস্থার সঙ্গে যুদ্ধ করছে। অথচ রাজধানীর দপ্তরগুলোতে বসে কর্মকর্তারা কাগজে-কলমে উন্নয়নের গল্প লিখছেন। বাস্তবের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। এখন সময় এসেছে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার, কারণ মানুষ আর ধৈর্য হারাচ্ছে।”

আসন্ন অবস্থান কর্মসূচি প্রসঙ্গে আরিফুল হক বলেন, “রোববারের কর্মসূচি থেকে আমরা সরকারের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করব। এই সময়ের মধ্যে যদি সিলেটের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার দৃশ্যমান উন্নয়ন না হয়, তাহলে আমরা আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাব।”

তিনি খানিকটা ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলেন, “যদি সরকার বলে যে সিলেটের জন্য তাদের কাছে টাকা নেই, তাহলে তারা সেটা ঘোষণা দিক। তখন আমরা আমাদের প্রবাসী ভাইবোনদের আহ্বান জানাব—তোমরা যত পারো সাহায্য করো, আমরা নিজেরাই আমাদের রাস্তা ঠিক করব।”

আরিফুল হকের বক্তব্যের পুরোটা জুড়ে ছিল সিলেটবাসীর বঞ্চনা ও কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অবহেলার কথা। তাঁর ভাষণে একদিকে যেমন উঠে এসেছে ক্ষোভ, অন্যদিকে ফুটে উঠেছে স্থানীয় নেতৃত্বের দায়িত্ববোধ ও সংগ্রামী মনোভাব।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার যে বেহাল চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে, সিলেট তার অন্যতম উদাহরণ। দীর্ঘ সময় ধরে চলমান সড়ক সংস্কারের ধীরগতি শুধু যানজট নয়, বরং অর্থনৈতিক কার্যক্রমকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

আরিফুল হকের এই আহ্বান মূলত সরকারের প্রতি এক মানবিক ও বাস্তবতাভিত্তিক চ্যালেঞ্জ, যেখানে তিনি সরাসরি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ নেতৃত্বকে জনগণের দুর্ভোগ নিজের চোখে দেখার জন্য। তাঁর এই আমন্ত্রণ কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এক ধরনের নৈতিক আহ্বান—জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য, উন্নয়নকে কাগজে নয়, বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য।

সিলেটবাসীর আশা, প্রধান উপদেষ্টা এই আমন্ত্রণে সাড়া দেবেন এবং সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে পরিস্থিতি উপলব্ধি করবেন। কারণ সড়ক শুধু পথ নয়—এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে, অর্থনীতির সঙ্গে, দেশের গতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। আর যদি সত্যিই অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্য হয় জনগণের আস্থা অর্জন, তাহলে সিলেটবাসীর এই প্রত্যাশা পূরণই হতে পারে তার প্রথম পদক্ষেপ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত