প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ—যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্ম ও মতের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। এই মাটির মানুষ বারবার প্রমাণ করেছে, ভিন্ন ধর্ম হলেও তারা একে অপরের উৎসব ভাগ করে নেয়, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায় আনন্দে ও বিপদে। এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত সম্প্রীতি সমাবেশে ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ.ফ.ম খালিদ হোসেনের বক্তব্যে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেছেন, এই দেশ সব ধর্মের মানুষের—তাই রাষ্ট্রীয় খরচে মন্দির নির্মাণের দাবি সম্পূর্ণ যৌক্তিক।
শনিবার (১১ অক্টোবর) দুপুরে রাঙামাটি শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত সম্প্রীতি সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন। উপদেষ্টার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ এই বক্তব্যকে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার শক্তিশালী প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে মতভেদও প্রকাশ করছেন। তবে রাষ্ট্রের একজন উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারক হিসেবে তার এমন অবস্থানকে অধিকাংশ বিশ্লেষক সাহসী ও সময়োপযোগী মন্তব্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
ড. আ.ফ.ম খালিদ হোসেন বলেন, “এই দেশ সব ধর্মের মানুষের। আমরা রাষ্ট্র হিসেবে সব ধর্মকে সমানভাবে মর্যাদা দিই। তাই যদি রাষ্ট্রীয় খরচে মসজিদ নির্মাণ হতে পারে, তবে মন্দির বা অন্য কোনো উপাসনালয় নির্মাণের দাবিও অযৌক্তিক নয়। রাষ্ট্রীয় খরচে ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে—এটি গর্বের বিষয়। তবে একইসঙ্গে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যেন অন্য ধর্মাবলম্বীরাও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে পরিচালনা করতে পারেন।”
তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দেশের ধর্মীয় সহাবস্থান ও রাষ্ট্রীয় সমতা নীতির ওপর নতুন করে দৃষ্টি পড়েছে। সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই একটি বহুধর্মীয় সমাজের শক্তির উৎস—এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, “আমি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। আমার দায়িত্ব হচ্ছে নিশ্চিত করা যে দেশের কোনো নাগরিক ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে যেন কখনো ভীত বা বঞ্চিত না হয়। তারা যেন উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে পূজা-পার্বণ, ওরশ, কিংবা ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতে পারে—এই নিশ্চয়তা দেওয়াই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।”
সম্প্রীতি সমাবেশে তিনি আরও বলেন, “আমরা একটি সেক্যুলার রাষ্ট্রে বাস করছি। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের সেবায় নয়, বরং প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মর্যাদা রক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই সত্যিকার ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠিত হবে।” তার এই বক্তব্যে উপস্থিত শ্রোতাদের অনেকেই করতালির মাধ্যমে সমর্থন জানান।
ধর্ম উপদেষ্টা আরও বলেন, “আমি কোনো বিতর্কে যেতে চাই না যে আগের ধর্মমন্ত্রী কোথায় গিয়েছিলেন বা কে কী করেছেন। আমার কাজ হলো রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে, দেশের প্রতিটি নাগরিক তার ধর্ম পালন করছে কিনা, তারা ভয় ছাড়াই উৎসব করছে কিনা। সেটাই আমার দায়িত্ব।”
সমাবেশে ‘সেফ এক্সিট’ প্রসঙ্গেও কথা বলেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, “এই দেশ আমাদের। এটাই আমাদের শেষ ঠিকানা। আমরা স্বাভাবিক এক্সিট চাই, যেখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচন হবে এবং শান্তিপূর্ণভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে। আমরা নিজেদের জন্য কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না। আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো সেকেন্ড হোম রাখি না, এমনকি দেশে নিজের বাড়িও নেই, ভাড়া বাসায় থাকি। তাই আমার চাওয়া কেবল একটি স্বচ্ছ রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর।”
তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, উপদেষ্টার বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকলেও তা যেন সহনশীলতা ও সাংবিধানিক নিয়ম মেনে হয়।
রাঙামাটির এই সম্প্রীতি সমাবেশের আয়োজন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ওলামা পরিষদ। সমাবেশের উদ্দেশ্য ছিল পাহাড়ি অঞ্চলে বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি ও বোঝাপড়া জোরদার করা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি হাজী শরীয়ত উল্লাহ।
সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ছাদেক আহমদ, জেলা প্রশাসক হাবিব উল্লাহ, পুলিশ সুপার ড. এস. এম. ফরহাদ হোসেন, জেলা জামায়াতের আমির আবদুল আলীমসহ প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানে বক্তারা ধর্মীয় সম্প্রীতির ঐতিহ্য বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তারা বলেন, পাহাড়ি ও সমতলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করছে। তবে সময় সময় ভুল বোঝাবুঝি বা বিভাজনের রাজনীতি সেই সম্পর্কের বন্ধনকে দুর্বল করতে পারে। তাই রাষ্ট্র, সমাজ ও ধর্মীয় নেতাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সম্প্রীতি রক্ষায় উদ্যোগ নিতে হবে।
ড. খালিদ হোসেনের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, সরকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় এবং সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মূল দর্শনই হচ্ছে মানবিকতা ও সহনশীলতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেই আদর্শই আমরা বাস্তবায়ন করছি। তাই মন্দির, গির্জা বা প্যাগোডার জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা দেওয়া অসাংবিধানিক নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব।”
সম্প্রীতি সমাবেশ শেষে ধর্ম উপদেষ্টা রাঙামাটির মনোঘর আবাসিক বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত প্রথম সম্মিলিত জাতীয় কঠিন চীবর দান উৎসবে যোগ দেন। সেখানে বিভিন্ন বৌদ্ধ ভিক্ষু ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং শান্তি ও সহাবস্থানের বার্তা তুলে ধরেন।
তার সফরকে স্থানীয়রা ঐতিহাসিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কারণ দীর্ঘদিন পর একজন রাষ্ট্রীয় পদাধিকারী এভাবে প্রকাশ্যে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন।
রাঙামাটির জনগণ ও স্থানীয় সংগঠনের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, এমন উদ্যোগ পাহাড়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ককে আরও মজবুত করবে।
একজন প্রবীণ স্থানীয় নাগরিকের ভাষায়, “যদি রাষ্ট্র মসজিদ নির্মাণে অর্থ ব্যয় করতে পারে, তাহলে মন্দির, গির্জা বা প্যাগোডার ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত। উপদেষ্টার এই বক্তব্য আমাদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।”
ধর্ম উপদেষ্টার এই সফর ও বক্তব্য তাই শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং এক মানবিক বার্তা বহন করে—যে বাংলাদেশে সব ধর্ম, সব মানুষ সমান মর্যাদায় বেঁচে থাকবে।