প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য নিরসন ও টেকসই উন্নয়নের বৈশ্বিক আলোচনায় বাংলাদেশের সক্রিয় উপস্থিতি আরও একবার দৃশ্যমান হতে যাচ্ছে। এসব ইস্যুতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান ও প্রতিশ্রুতি তুলে ধরতে ইতালির রাজধানী রোমের উদ্দেশে দেশ ছেড়েছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি যোগ দেবেন বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে, যেখানে বিশ্বের শীর্ষ নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ ও মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রধানরা অংশ নিচ্ছেন।
রোববার (১২ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সরকারপ্রধান ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইট ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রওনা হয়। বিমানবন্দরে তাকে বিদায় জানান মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য, কূটনীতিক এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা। রোমের উদ্দেশে যাত্রার সময় ইউনূস সংক্ষেপে বলেন, “বাংলাদেশ আজ খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের এক অনন্য মডেল। আমি বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে আমাদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতে যাচ্ছি।”
রোমে অনুষ্ঠিতব্য এই সম্মেলনের আয়োজন করেছে জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (World Food Programme – WFP), যার সদর দপ্তর রোমেই অবস্থিত। ডব্লিউএফপি বৈঠকটি এ বছর অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১০ থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খাদ্য উৎপাদন হ্রাস, বৈশ্বিক দারিদ্র্য, খাদ্য সরবরাহের সংকট ও ন্যায্য বণ্টন—এই চারটি প্রধান ইস্যু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস জানিয়েছে, ফোরামের মূল অধিবেশনে বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ, ক্ষুদ্রঋণ মডেল এবং স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য সংরক্ষণে সামাজিক উদ্যোক্তা কার্যক্রমের সাফল্য তুলে ধরবেন বলে জানা গেছে।
এছাড়া সফরকালে প্রধান উপদেষ্টা ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-র মহাপরিচালক কু ডংইউ, আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (IFAD)-এর প্রেসিডেন্ট আলভারো লারিও এবং ইউরোপীয় কমিশনের মানবিক সহায়তা বিষয়ক কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা কৌশল, দারিদ্র্য নিরসন কর্মসূচি, এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি উন্নয়নের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বৈশ্বিক পর্যায়ে খাদ্য সংকট এখন একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্য সরবরাহে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশের অভিজ্ঞতা বিশ্বকে নতুন পথ দেখাতে পারে।
অধ্যাপক ইউনূস, যিনি নিজে একজন নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি, তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক ব্যবসার ধারণার জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত। খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য নিরসনে সামাজিক উদ্যোগকে একটি স্থায়ী সমাধান হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে মডেল তিনি প্রচার করেছেন, তা ইতিমধ্যে বিশ্বের বহু দেশে গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে তাঁর বক্তব্য ও অংশগ্রহণ এই বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
সরকারি সূত্র জানায়, সফরের অংশ হিসেবে ইউনূস বাংলাদেশের পক্ষে ‘গ্লোবাল ফুড রেজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভ’-এ (Global Food Resilience Initiative) নতুন অংশীদারত্ব ঘোষণা করবেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতে আন্তর্জাতিক সহায়তা ও প্রযুক্তি বিনিময় আরও জোরদার হবে।
প্রধান উপদেষ্টা রোমে অবস্থানকালে বাংলাদেশ দূতাবাস আয়োজিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায়ও যোগ দেবেন। সেখানে তিনি প্রবাসীদের অবদান, বিশেষ করে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বিদেশে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গঠনে তাদের ভূমিকা তুলে ধরবেন।
সফর শেষে আগামী ১৫ অক্টোবর তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
অধ্যাপক ইউনূসের এ সফর কেবল একটি কূটনৈতিক সফর নয়, বরং এটি বাংলাদেশের মানবিক ও উন্নয়নমূলক দর্শনের আন্তর্জাতিক প্রদর্শন। একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইতোমধ্যে তাঁর অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করেছে। রয়টার্স, বিবিসি ও আল-জাজিরা—সবগুলোই জানিয়েছে যে, এই বৈঠকে ইউনূস বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক উদ্যোক্তা উদ্যোগকে একত্রে দেখার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করবেন।
বাংলাদেশের সরকারি পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, রোমে অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠকে ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল আন্তর্জাতিক সহায়তা আকর্ষণ ও কৃষি প্রযুক্তি বিনিয়োগে নতুন দ্বার খুলতে সক্ষম হবে। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ যে হুমকির মুখে পড়েছে, তা মোকাবিলায় এখন বিশ্বকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিক পরিসরে বারবার বলেছেন, দারিদ্র্য কোনো অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং এটি একটি নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতা। তিনি বিশ্বাস করেন, রাষ্ট্রীয় নীতিতে মানবিকতা, উদ্ভাবন এবং টেকসই ব্যবসার মিশ্রণ ঘটালে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব। রোমে অনুষ্ঠিতব্য ডব্লিউএফপি বৈঠকটি তাই তাঁর দীর্ঘদিনের দারিদ্র্যবিরোধী দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
এই সফরকে ঘিরে দেশীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে বৈশ্বিক পরিসরে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা এবং উন্নয়ন নীতির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
সরকারি এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বাংলাদেশ আজ শুধু খাদ্য উৎপাদনে নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচার ও টেকসই উন্নয়নেও উদাহরণ তৈরি করেছে। রোমে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের মাধ্যমে বিশ্ব আরও একবার সেই বাংলাদেশের চিত্র দেখবে—যে বাংলাদেশ স্বনির্ভর, মানবিক ও নীতিনিষ্ঠ।”
প্রধান উপদেষ্টার রোম সফর তাই একদিকে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করবে, অন্যদিকে দেশীয়ভাবে মানবিক রাষ্ট্রচিন্তার প্রতি সরকারের অঙ্গীকারকে নতুন করে তুলে ধরবে। রোমের বৈঠকে তাঁর বক্তব্য ও বৈঠকগুলোর ফলাফল আগামী মাসে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় উন্নয়ন সম্মেলনে পর্যালোচনা করা হবে বলে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে এই সফর শুধু একটি কূটনৈতিক কার্যক্রম নয়—এটি বাংলাদেশের সামাজিক অগ্রগতি, ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন ও বিশ্বমঞ্চে মানবিক নেতৃত্ব প্রদর্শনের এক প্রতীকী পদক্ষেপ।