প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুস মনে করেন, আজকের যুবসমাজই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নয়, তারা বরং বর্তমানেরই চালিকাশক্তি। তাদের কল্পনা, বুদ্ধি ও উদ্যমের মাধ্যমেই আগামী বিশ্বের কাঠামো তৈরি হবে। তাই তরুণদের তিনি আহ্বান জানিয়েছেন নিজেদের ভেতরের শক্তিকে চিনে নিয়ে সাহসী ও দূরদর্শী হয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক, টেকসই ও মানবিক বিশ্ব গড়ে তুলতে।
শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় সুইডেন ও নরওয়ের তরুণ রাজনৈতিক নেতাদের এক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা এই বার্তা দেন। দুই দেশের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইক্স (সুইডেন) ও হাকোন এরাল্ড গুলব্র্যান্ডসেন (নরওয়ে) নেতৃত্ব দেন প্রতিনিধি দলে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ইউএনডিপির বাংলাদেশের রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ স্টেফান লিলারসহ সংস্থাটির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা।
প্রধান উপদেষ্টা তরুণ নেতাদের উদ্দেশে বলেন, “লোকেরা বলে, তরুণরাই ভবিষ্যৎ। কিন্তু আমি বলি, তরুণরাই বর্তমান। আপনারা এমন এক প্রজন্ম, যারা প্রযুক্তি ও জ্ঞানের শক্তিকে নিজের করে নিয়েছে। আপনারা প্রায় সুপারহিউম্যান—কল্পনা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনের দিক থেকে আপনাদের ক্ষমতা সীমাহীন। তাই শুধু প্রশ্ন করুন—‘আমি কী ধরনের বিশ্ব তৈরি করতে চাই?’ তারপর নিজের উত্তর অনুযায়ী কাজ শুরু করুন।”
বৈঠকে উপস্থিত সুইডেন ও নরওয়ের তরুণ নেতারা ছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিনিধি। সুইডেনের পক্ষ থেকে এলিস ল্যান্ডারহোম (মডারেট যুব পার্টি), অ্যারিয়ান টওয়ানা (সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক যুব পার্টি), অ্যান্টন হোমলুন্ড (লিবারাল যুব পার্টি), ডেক্সটার ক্রোকস্টেড (সুইডেন ডেমোক্র্যাটস যুব), হানা লিন্ডকভিস্ট (গ্রীন যুব পার্টি) এবং ম্যাক্স পেলিন (ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক যুব পার্টি) উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে নরওয়ের পক্ষ থেকে ছিলেন ওডা রোহ্মে সিভার্টসেন (ইয়ং কনজারভেটিভস), লার্স মিকায়েল বারস্টাড লোভল্ড (প্রগ্রেস পার্টি যুব) ও সিভার ক্লেভ কোলস্টাড (রেড যুব)।
তরুণ নেতাদের সঙ্গে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠকে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন, জুলাই বিপ্লব, যুব অংশগ্রহণ, প্রশাসনিক সংস্কার এবং আসন্ন নির্বাচনের বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বাংলাদেশের চলমান গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রধান উপদেষ্টার মতামত জানতে চান।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “জুলাই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত। তরুণরাই সেখানে নেতৃত্ব দিয়েছে, ফ্যাসিবাদ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা শুধু পরিবর্তনের দাবি তোলেনি, বরং পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এই আন্দোলনই দেখিয়েছে, যুবসমাজ যদি ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে কোনো অন্যায় টিকে থাকতে পারে না।”
তিনি বলেন, “আপনারা এমন সময়ে বাংলাদেশে এসেছেন যখন আমরা গভীর সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। সংস্থা সংস্কার, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক পুনর্গঠন—সবকিছুতেই যুব সমাজের ভূমিকা অপরিহার্য। আমি আশা করি, আপনারা এখানে এসে বাংলাদেশের তরুণদের সঙ্গে কথা বলবেন, তাদের গল্প শুনবেন এবং এই পরিবর্তনের স্পন্দন অনুভব করবেন।”
প্রফেসর ইউনুস জানান, জুলাই বিপ্লবের পর নাগরিকদের দাবির ভিত্তিতে সরকার দুটি বড় সংস্কার কমিশন গঠন করেছে—সংবিধান সংস্কার কমিশন এবং কনসেনসাস কমিশন। তিনি বলেন, “ত্রিশটিরও বেশি রাজনৈতিক দল এই আলোচনায় অংশ নিয়েছে। তারা দীর্ঘ এক মাসের সংলাপ শেষে একমতে পৌঁছেছে। এই মাসেই আমরা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করতে যাচ্ছি—যা হবে বাংলাদেশের নতুন সামাজিক চুক্তির সূচনা।”
বৈঠকের এক পর্যায়ে প্রধান উপদেষ্টা বিদেশি তরুণ নেতাদের বাংলাদেশের বাস্তবতা কাছ থেকে দেখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আমি আপনাদের বলব, ঢাকার রাস্তায় হাঁটুন, গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলুন, তরুণদের চোখে তাকান। প্রতিটি দেয়ালচিত্র, প্রতিটি গ্রাফিতি—এগুলো শুধু রঙ নয়, এগুলো এক বিপ্লবের সাক্ষী। এগুলো প্রমাণ করে, এই দেশের তরুণরা জেগে উঠেছে, তারা অন্যায় মেনে নিতে রাজি নয়।”
তিনি তরুণদের মধ্যে সাহস, মানবিকতা ও উদ্ভাবনের চর্চা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। তার মতে, “আজকের বিশ্বে বড় সমস্যা শুধু দারিদ্র্য বা বেকারত্ব নয়, বরং মানবিকতা হারানো। প্রযুক্তি যতই অগ্রসর হচ্ছে, মানুষ ততই একা হয়ে পড়ছে। তাই সমাজকে নতুনভাবে ভাবতে হবে, যেখানে অর্থনীতি শুধু মুনাফার নয়, মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করবে।”
বৈঠকে প্রফেসর ইউনুস তার বহুল আলোচিত “তিন শূন্য” ধারণার কথাও ব্যাখ্যা করেন—শূন্য কার্বন নির্গমন, শূন্য ধনকেন্দ্রীকরণ ও শূন্য বেকারত্ব। তিনি বলেন, “আমাদের পৃথিবীকে টেকসই রাখতে হলে এই তিনটি শূন্য অর্জন অপরিহার্য। জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে। অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে হবে, যাতে সম্পদ কেবল কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত না হয়। আর কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে—যেখানে প্রত্যেকে হবে নিজের কাজের মালিক।”
তার সামাজিক ব্যবসার ধারণা নিয়েও কথা বলেন ইউনুস। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “সামাজিক ব্যবসার উদ্দেশ্য মুনাফা নয়, সমস্যার সমাধান। উদ্যোক্তা পদ্ধতিতেই সমাজের সমস্যা সমাধান সম্ভব—চ্যারিটি নয়, উদ্ভাবনই হতে পারে মানবতার সবচেয়ে বড় অবদান।”
বৈঠকে ইউএনডিপির রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ স্টেফান লিলার বলেন, “বাংলাদেশ বর্তমানে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তরুণদের অংশগ্রহণ, গণতান্ত্রিক সংস্কার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ আজ একটি উদাহরণ তৈরি করছে।”
প্রধান উপদেষ্টা ইউনুস তরুণদের উদ্দেশে আরও বলেন, “আপনারা এমন এক সময় বড় হচ্ছেন, যখন পৃথিবী বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু সংকট, প্রযুক্তির দৌরাত্ম্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসার—সবকিছুই আমাদের জীবন বদলে দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের মুখে আপনাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আপনারা কি শুধু দর্শক হয়ে থাকবেন, নাকি নিজেরাই ইতিহাস লিখবেন।”
বৈঠক শেষে তরুণ নেতারা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আলাপচারিতায় নিজেদের অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরেন। তারা বাংলাদেশের শান্তিপূর্ণ গণঅভ্যুত্থান ও নাগরিক সমাজের ভূমিকার প্রশংসা করেন। প্রতিনিধি দলের একজন বলেন, “বাংলাদেশের তরুণরা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। পরিবর্তন কেবল কথা নয়, তা কেমন করে বাস্তবে রূপ নিতে পারে—বাংলাদেশ তার প্রমাণ।”
বৈঠকের পরিবেশ ছিল আন্তরিক ও প্রাণবন্ত। হাসিমুখে আলোচনার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে ভ্রাতৃত্বের এক বন্ধন—যেখানে জাতি, ধর্ম, রাজনীতি, ভৌগোলিক সীমানা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
বৈঠকের শেষে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, পৃথিবীর ইতিহাস বদলাবে তরুণদের হাতেই। আপনারা আজ যেভাবে ভাবছেন, সেভাবেই গড়ে উঠবে আগামী পৃথিবী। তাই ভয় পাবেন না—স্বপ্ন দেখুন, কাজ শুরু করুন, আর নিজের ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তুলুন।”
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সেদিনের বিকেলটি যেন হয়ে উঠেছিল এক অনুপ্রেরণার মুহূর্ত। আলোচনার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি হাসি, প্রতিটি প্রতিশ্রুতি যেন ভবিষ্যতের প্রতি নতুন এক আশার বার্তা দেয়—যে বিশ্ব হবে মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক এবং তরুণদের কল্পনা দিয়ে নির্মিত।