প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) দাখিল করা চার্জশিটে নাম আসা ১৫ জন কর্মরত সেনা কর্মকর্তাকে সেনা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি একজন অবসর-পূর্ব ছুটিতে (এলপিআর) থাকা কর্মকর্তাকেও একইভাবে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে বিরল হলেও সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধার প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শনিবার ঢাকার সেনানিবাসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানিয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামান। তিনি বলেন, “গত ৮ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তিনটি চার্জশিট জমা পড়ে। এর মধ্যে দুটি ছিল ডিজিএফআই ও র্যাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, এবং আরেকটি রামপুরায় সংঘটিত ৪-৫ আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। আমরা সংবাদটি পাই টেলিভিশনের স্ক্রল থেকে, সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে।”
মেজর জেনারেল হাকিমুজ্জামান জানান, “চার্জশিটের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা দেখি, ট্রাইব্যুনাল তা গ্রহণ করেছে এবং পরোয়ানা জারি করেছে। তবে এখন পর্যন্ত সেনাবাহিনী কোনো আনুষ্ঠানিক চার্জশিট বা পরোয়ানা হাতে পায়নি। নিয়ম অনুযায়ী আইজিপির দপ্তর থেকে এটি সেনাবাহিনীতে পৌঁছানোর কথা। তবুও আমরা নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নিয়েছি, কারণ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা আমাদের ঐতিহ্য।”
তিনি আরও বলেন, “প্রায় ২৫ জন সেনা কর্মকর্তার নাম এসেছে চার্জশিটে। এর মধ্যে ৯ জন অবসরপ্রাপ্ত, ১ জন এলপিআরে এবং ১৫ জন কর্মরত। যেহেতু অবসরপ্রাপ্তদের ওপর সেনা আইন সরাসরি প্রযোজ্য নয়, তাই কর্মরত কর্মকর্তাদের আমরা সেনা হেফাজতে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটি আমাদের নিয়মিত প্র্যাকটিস—যখনই কোনো কর্মকর্তা বা সদস্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আসে, তখন তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের হেফাজতে রাখা হয়।”
অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল আরও জানান, “আমরা ৮ অক্টোবরই সংশ্লিষ্ট ১৫ কর্মকর্তার কাছে আনুষ্ঠানিক নির্দেশ পাঠিয়েছি যেন তারা ৯ অক্টোবরের মধ্যে সেনানিবাসে উপস্থিত হয়ে সেনা হেফাজতে আসেন। আমাদের নির্দেশ সবাই মেনে চলেছেন, তবে একজন কর্মকর্তা এখনো অনুপস্থিত।”
তিনি উল্লেখ করেন, “যে কর্মকর্তা এখনো সাড়া দেননি, তিনি মেজর জেনারেল কবির আহাম্মদ। ৯ অক্টোবর সকালে তিনি বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন, পরিবারের কাছে বলেছিলেন একজন আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। এরপর তিনি আর ফেরেননি, ফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। আমরা তার পরিবার, সহকর্মী, সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাসহ সবার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, কিন্তু এখনো তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।”
এ বিষয়ে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। “আমরা তাকে নিয়ম অনুযায়ী ‘ইলিগ্যাল এবসেন্ট’ ঘোষণা করেছি। এরপর ডিজিএফআই, এনএসআই ও বিজিবিকে জানানো হয়েছে যেন তিনি স্থল, নৌ বা আকাশপথে দেশত্যাগ করতে না পারেন। আমি নিজে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মহাপরিচালকদের সঙ্গে কথা বলেছি। তার গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনাতেও লোক পাঠানো হয়েছে,” বলেন মেজর জেনারেল হাকিমুজ্জামান।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সংবিধান ও দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। আমরা কোনো অবস্থাতেই আইনের বাইরে কাজ করি না। অতীতেও সেনাবাহিনীতে এমন সংবেদনশীল বিষয় এসেছে, তখনও আমরা আইন ও ন্যায়বিচারের পথেই থেকেছি। সেনাবাহিনীর ৫৪ বছরের ইতিহাসে এই নীতি কখনো বদলায়নি।”
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, “যখন কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে, আমরা তা প্রথমে অভ্যন্তরীণভাবে পরীক্ষা করি। পরে আদালত বা ট্রাইব্যুনাল যদি কোনো পদক্ষেপ নেয়, আমরা সেটিকে পুরোপুরি সহযোগিতা করি। প্রয়োজন হলে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। এভাবেই সেনাবাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা ও ন্যায়ের ভারসাম্য রক্ষা করা হয়।”
ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে আছেন—মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, মেজর জেনারেল কবির আহাম্মদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, কর্নেল কে এম আজাদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুব আলম, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মশিউর রহমান জুয়েল এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন।
যদিও সেনা বাহিনীর পক্ষ থেকে এখনো চার্জশিটের কপি পাওয়া যায়নি, তবুও অভ্যন্তরীণ নীতির ভিত্তিতে হেফাজতের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—যা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী একটি পেশাদার ও দায়বদ্ধ প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঢাকা সেনানিবাসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সেনাবাহিনী আসলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে—যে বাহিনীর সদস্যরাও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এটি শুধু শৃঙ্খলার বিষয় নয়, বরং প্রতিষ্ঠানটির নৈতিক শক্তির প্রতিফলন।”
এদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চার্জশিটে সেনা কর্মকর্তাদের নাম আসা দেশের বিচারব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তারা আশা প্রকাশ করেছে, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে এবং কোনো প্রভাব বা পক্ষপাত যেন এ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত না করে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে ঘিরে চলছে নানা আলোচনা। অনেকেই বলছেন, রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর ভেতরে সেনাবাহিনীর এমন সক্রিয় সহযোগিতা বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও শক্তিশালী করে তুলবে।
সবশেষে মেজর জেনারেল হাকিমুজ্জামান বলেন, “আমরা কারও প্রতি পক্ষপাত দেখাচ্ছি না। কেউ যদি অপরাধ করে, তার বিচার হবে; আর কেউ নির্দোষ হলে সম্মানের সঙ্গে মুক্ত হবেন। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী সেই ন্যায়ের পক্ষেই আছে, আজ যেমন ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে।”
এই ঘটনায় দেশের প্রশাসনিক ও সামরিক পরিমণ্ডলে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো—যেখানে রাষ্ট্রীয় আইন ও সামরিক শৃঙ্খলা একসঙ্গে কাজ করছে ন্যায়বিচারের স্বার্থে। একদিকে বিচারিক প্রক্রিয়া এগোচ্ছে আইসিটির কাঠামো অনুযায়ী, অন্যদিকে সেনাবাহিনী নিজস্ব শৃঙ্খলার বলয়ে থেকে দিচ্ছে আইনের প্রতি অবিচল আনুগত্যের বার্তা।
গণতন্ত্র ও দায়বদ্ধতার এই যুগে, এমন একটি দৃষ্টান্ত নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিণত ও পেশাদার মনোভাবের প্রতীক হয়ে থাকবে।