প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরামের ফ্ল্যাগশিপ ইভেন্টে যোগ দিতে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস রোববার সকালে ইতালির রাজধানী রোমের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। তার সঙ্গে সফরসঙ্গী ছিলেন সরকারের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও উপদেষ্টা। সকাল সাড়ে ১১টায় বাংলাদেশ বিমানের একটি নির্ধারিত ফ্লাইটে তারা হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করেন। এ সফরকে ঘিরে দেশ-বিদেশের নানা মহলে আগ্রহ দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে ইউনূসের সঙ্গে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সাক্ষাৎ হবে কিনা—এ নিয়েই চলছে আলোচনা।
প্রধান উপদেষ্টার এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) আয়োজিত ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরামের মূল অধিবেশনে অংশগ্রহণ করা। সেখানে তিনি বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে ভাষণ দেবেন বলে জানানো হয়েছে। বক্তৃতায় তিনি টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বিকাশ এবং সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা ইত্যাদি বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবেন বলে জানা গেছে।
প্রধান উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা যায়, রোমে অবস্থানকালে ড. ইউনূসের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও দাতাগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব বৈঠকে খাদ্যনিরাপত্তা, দারিদ্র্য নিরসন, টেকসই কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ে আলোচনা হবে। তিনি আরও কয়েকটি দেশের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হবেন বলেও ধারণা করা হচ্ছিল।
এমন প্রেক্ষাপটে রবিবার দুপুরে দেশের কিছু গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে, রোম সফরে ইউনূস ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এমনকি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসও তাদের প্রতিবেদনে এ ধরনের একটি সম্ভাব্য বৈঠকের উল্লেখ করে। কিন্তু রাতেই প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে বিষয়টি নিয়ে একটি ব্যাখ্যা দেন, যা পুরো বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে।
নিজের স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, “কিছু সংবাদমাধ্যম, এমনকি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসও জানিয়েছে যে, প্রধান উপদেষ্টা রোম সফরে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে বৈঠক করবেন। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই— এই বিষয়ে বাসস বা অন্য কোনো সংবাদমাধ্যম আমার সঙ্গে কথা বলেনি।”
তিনি আরও লেখেন, “বুধবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে আমি জানিয়েছিলাম, প্রধান উপদেষ্টা রোম যাচ্ছেন ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরামের সভায় যোগ দিতে এবং সেখানে তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেবেন। কিন্তু কোথাও আমি বলিনি যে, ইতালির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হবে। বাস্তবে এমন কোনো বৈঠক নির্ধারিতও ছিল না।”
তার এই স্পষ্টীকরণের পর বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ড. ইউনূসের সফরে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক নির্ধারিত নেই। তবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, রোমে অবস্থানকালে ফোরামের আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোনো সেশনে উভয়ের সাক্ষাৎ বা সৌজন্য বিনিময় হতে পারে।
ড. ইউনূসের রোম সফরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে আগ্রহের কারণ শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতিতে তার নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা সম্পর্কেও ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিশেষ করে দেশে গণতান্ত্রিক রূপান্তর, প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টিতে তিনি কী ভূমিকা রাখছেন, তা বিশ্বনেতাদের দৃষ্টিতে গুরুত্ব পাচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরাম বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক আয়োজন, যেখানে প্রতি বছর সরকার, ব্যবসা, বিজ্ঞানী ও সামাজিক উদ্যোক্তারা একত্রিত হন বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থা উন্নয়নের উপায় নিয়ে আলোচনা করতে। এই ফোরামে বাংলাদেশ থেকে ড. ইউনূসের অংশগ্রহণ কেবল দেশের প্রতিনিধিত্ব নয়, বরং তার দীর্ঘদিনের কাজ—দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক ব্যবসার মডেল—আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুনভাবে আলোচনায় আনবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর থেকে বিশ্বব্যাপী সামাজিক উদ্যোক্তা ও টেকসই উন্নয়ন ধারণার এক অনন্য দূত হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক ও বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে একটি সফল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করেছে। বর্তমান সময়েও, প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
রোম সফরের সময়সূচি অনুযায়ী, ইউনূস ফোরামের উদ্বোধনী অধিবেশনে অংশ নেবেন, যেখানে বিশ্বের প্রভাবশালী নীতিনির্ধারক, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান এবং উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত থাকবেন। সেখানে তিনি দারিদ্র্যমুক্ত ও ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ার জন্য সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানাবেন। ফোরামে তার ভাষণকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের আগ্রহও ইতোমধ্যে বাড়ছে।
এদিকে, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের মন্তব্যে ইতালির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎসংক্রান্ত বিভ্রান্তির অবসান ঘটলেও, সফরের সময় অন্য কোনো উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হতে পারে কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের এই সফরটি মূলত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের উপস্থিতি ও ইতিবাচক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরামে অংশ নিতে ড. ইউনূসের ইতালি সফর কেবল একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান নয়, বরং বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তার নেতৃত্ব, দর্শন ও কূটনৈতিক অবস্থানকে নতুনভাবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইতালির প্রধানমন্ত্রী মেলোনির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক না থাকলেও, এই সফর বাংলাদেশের জন্য এক কৌশলগত ও ভাবমূর্তিগত তাৎপর্য বহন করছে—যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভবিষ্যতের সম্পর্ক পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।