প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের কৃষি খাতের ভবিষ্যৎকে টেকসই ও উদ্যোক্তাভিত্তিক করার লক্ষ্যে তরুণ, নারী ও কৃষকদের সহায়তায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রস্তাব দিয়েছেন দেশের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (আইএফএডি) প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যেন বাংলাদেশে একটি বিশেষ ‘সোশ্যাল বিজনেস ফান্ড’ বা সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠন করা হয় — যা সরাসরি কাজ করবে কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য এবং নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে।
রোববার (১২ অক্টোবর) ইতালির রোমে অনুষ্ঠিত বিশ্ব খাদ্য ফোরামের সাইডলাইনে আইএফএডি প্রেসিডেন্ট আলভারো লারিওর সঙ্গে বৈঠকে এই প্রস্তাব দেন অধ্যাপক ইউনূস। আলোচনায় তিনি বাংলাদেশের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি শক্তিশালী আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “এই ধরনের একটি তহবিল কেবল অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হতে পারে। এটি দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্যসেবা, নারী ক্ষমতায়ন এবং টেকসই খাদ্য উৎপাদনসহ নানা সামাজিক সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখবে। তরুণরা যেন কৃষিকে শুধুমাত্র জীবিকা নয়, বরং একটি উদ্ভাবনী ব্যবসা হিসেবে দেখতে পারে— সেটিই আমাদের লক্ষ্য।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন, সামাজিক ব্যবসা মডেল এমন এক উদ্যোগ যেখানে বিনিয়োগের উদ্দেশ্য মুনাফা নয়, বরং সামাজিক উন্নয়ন ও মানবিক কল্যাণ। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে এই তহবিল তরুণ প্রজন্মকে কৃষির আধুনিকায়ন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিতে যুক্ত করবে বলে তাঁর বিশ্বাস।
বৈঠকে দুই নেতা বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য খাতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। আলোচনায় উঠে আসে—বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণের বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রযুক্তি ও জ্ঞানের অভাবে স্থানীয় জেলেরা এখনো তা কাজে লাগাতে পারছেন না। এ বিষয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “আমাদের জেলেরা এখনও অগভীর পানিতে মাছ ধরতে অভ্যস্ত। কিন্তু বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র আমাদের জন্য নতুন সম্পদভাণ্ডার। প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ পেলে বাংলাদেশ এখান থেকে বিপুল পরিমাণ মৎস্যসম্পদ আহরণ করতে পারবে।”
এ সময় আইএফএডি প্রেসিডেন্ট আলভারো লারিও বাংলাদেশের কৃষি খাতের অগ্রগতি ও উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে আইএফএডি বর্তমানে একাধিক কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করছে। আমরা সামাজিক ব্যবসা ধারণার মাধ্যমে নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী, বিশেষ করে বেসরকারি খাতের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে।”
লারিও আরও জানান, আইএফএডি বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারণে আগ্রহী এবং কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলোতে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে যে উদ্যম ও সৃজনশীলতা দেখছি, তা শুধু দেশের অর্থনীতি নয়, বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও একটি অনুপ্রেরণার উৎস।”
অধ্যাপক ইউনূস বৈঠকে বাংলাদেশের কৃষি পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের আম ও কাঁঠালের রপ্তানিকে সম্প্রসারণের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা আম রপ্তানি শুরু করেছি, কিন্তু এর পরিমাণ এখনো সীমিত। আমাদের আরও বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন, যাতে এই ফলগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়মিতভাবে সরবরাহ করা যায়। চীন বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণে আম ও কাঁঠাল আমদানিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। এটি আমাদের কৃষকদের জন্য এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড স্টোরেজ ও পরিবহন ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ জরুরি। না হলে কৃষক পরিশ্রম করলেও লাভবান হতে পারবেন না। সামাজিক ব্যবসা তহবিলের অর্থ দিয়ে এই খাতে বিনিয়োগ করলে তা কৃষকদের আয়ের স্থায়ী উৎস হতে পারে।”
অধ্যাপক ইউনূস বৈঠকে আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের মহিষের দুধ থেকে মোজারেলা চিজ উৎপাদন এবং দুগ্ধজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা শুধু গরু ও ছাগলের দুধ নয়, মহিষের দুধ থেকেও বিশ্বমানের দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন করতে পারি। এতে দেশের দুধ উৎপাদন বাড়বে, পাশাপাশি রপ্তানির সুযোগও তৈরি হবে।”
বৈঠকে আলোচনার অন্যতম একটি দিক ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় কৃষিকে আরও সহনশীল ও টেকসই করার উদ্যোগ। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের কৃষি সবচেয়ে ঝুঁকিতে। আমাদের এমন কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে, যারা আধুনিক প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী চিন্তার মাধ্যমে এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবেন।”
আইএফএডি প্রেসিডেন্টের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টা তাঁকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। পাশাপাশি কৃষি, সামাজিক ব্যবসা ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো সরেজমিনে পর্যালোচনা করতে একটি প্রতিনিধি দল পাঠানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ এখন উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির পথে এগোচ্ছে। আমরা চাই, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই পরিবর্তন আরও দ্রুত হোক।”
প্রধান উপদেষ্টার এই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। বৈঠক শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বব্যাপী কৃষি বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তারা অধ্যাপক ইউনূসের এই উদ্যোগকে ‘কৃষি উন্নয়নের নতুন মডেল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তারা বলছেন, “যেখানে বিশ্বব্যাপী তরুণ প্রজন্ম কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ যদি সামাজিক ব্যবসা তহবিলের মাধ্যমে কৃষিকে লাভজনক ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, তবে তা অন্য দেশগুলোর জন্যও অনুকরণীয় উদাহরণ হবে।”
বিশ্ব খাদ্য ফোরামের এই আলোচনায় অধ্যাপক ইউনূসের বার্তা ছিল স্পষ্ট— কৃষি শুধু উৎপাদন নয়, এটি হতে পারে সামাজিক পরিবর্তনের মাধ্যম। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে যদি উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তি ও সামাজিক ব্যবসার মডেলের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে এই খাত কেবল দেশের খাদ্য নিরাপত্তাই নয়, সমগ্র অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশের কৃষির ইতিহাস যেমন শ্রম ও সম্ভাবনার, তেমনি এর ভবিষ্যৎও এখন নতুন আশার আলোয় আলোকিত হচ্ছে— যেখানে কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন একদল তরুণ, যারা জমির মাটি থেকে শুধু ফসল নয়, সৃষ্টি করছে পরিবর্তনের বীজ।