প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৫। নিজস্ব সংবাদদাতা। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
রাজধানীর ফার্মগেট ও পূর্ব রাজাবাজারে রবিবার রাতে পরপর তিন দফা ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আরিফুর রহমান হৃদয় (২৩) নামে এক যুবককে আটক করেছে, যিনি পিরোজপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি অনিকের অনুসারী বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনায় এলাকায় এক সময় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।
শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইমাউল হক বলেন, রাত ১০টার কিছু পর কারওয়ান বাজারের দিক থেকে আসা তিন আরোহী একটি মোটরসাইকেলে ফার্মগেট ফুটওভার ব্রিজের নিচে এসে প্রথম ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। বিস্ফোরণের পর পুলিশ ও স্থানীয়রা ধাওয়া দিলে তারা পূর্ব রাজাবাজারের মসজিদ গলির দিকে ছুটে যায় এবং সেখানে গিয়ে আরও দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এ সময় তিনজনের মধ্যে দুজন মোটরসাইকেলসহ পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও একজনকে স্থানীয়দের সহায়তায় হাতেনাতে আটক করে পুলিশ।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত সাড়ে ১০টার দিকে ফার্মগেট এলাকার ব্যস্ত সড়কে হঠাৎ করেই বিকট শব্দে চারদিক কেঁপে ওঠে। মানুষ দৌড়ে আশপাশের দোকান ও ভবনে আশ্রয় নেয়। কেউ কেউ প্রথমে ধারণা করেছিলেন গাড়ির চাকা বিস্ফোরণ হয়েছে, কিন্তু পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গেই তিন মোটরসাইকেল আরোহীকে পালাতে দেখা যায়, যাদের ধাওয়া করে স্থানীয় যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কিছু নেতাকর্মী।
ধাওয়া খেয়ে মোটরসাইকেল আরোহীরা পূর্ব রাজাবাজারে গিয়ে আরও দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়, যাতে একজন আহত হন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্য ও গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তারা দ্রুত অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন আরিফ নামে এক যুবককে আটক করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার কাছ থেকে জানা যাচ্ছে, কারা এই বিস্ফোরণ ঘটানোর সঙ্গে যুক্ত এবং উদ্দেশ্য কী ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি কোনো রাজনৈতিক বার্তা বা শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট সংগঠন বা গোষ্ঠীকে দায়ী করা যাচ্ছে না।
ঘটনার পর রাতেই শেরেবাংলা নগর থানার ওসি এবং ডিবি পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থল ঘিরে ফেলে বিস্ফোরণের আলামত সংগ্রহ করেন। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় ককটেলের অবশিষ্টাংশ, কিছু দাহ্য পদার্থ ও মোটরসাইকেলের অংশবিশেষ। ফরেনসিক টিম এসব আলামত সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য প্রেরণ করেছে।
এদিকে বিস্ফোরণের খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ফার্মগেটের ফুটওভার ব্রিজ এলাকায় এক সময় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দোকানপাট দ্রুত বন্ধ করে দেয় অনেক ব্যবসায়ী। স্থানীয়দের দাবি, রাতের ওই সময়টিতে সড়কে কিছু রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের সমাবেশও ছিল, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর নানা মন্তব্য উঠেছে। কেউ কেউ এটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর চেষ্টা বলে মন্তব্য করেছেন, আবার কেউ বলছেন, এটি ঢাকা শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। যারা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করতে ইতোমধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। একইসঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে, যাতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
শেরেবাংলা নগর থানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আটক যুবকের মোবাইল ফোন, কল রেকর্ড ও ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তার মাধ্যমে কেউ নির্দেশ দিয়েছিল কি না, সে বিষয়েও তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রহিম উদ্দিন বলেন, “হঠাৎ এমন বিস্ফোরণের শব্দে আমরা সবাই ভয়ে দৌড়ে ঘরে ঢুকে পড়ি। তারপর দেখি পুলিশ এসে এলাকায় তল্লাশি চালাচ্ছে। এমন ঘটনা আগে কখনো দেখিনি।”
রাজধানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের বিস্ফোরণ জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ঘটনার তদন্ত শেষে পুলিশ বিস্তারিত জানাবে বলে জানিয়েছে। তবে আপাতত নিরাপত্তা বাহিনী এলাকাজুড়ে টহল বাড়িয়েছে এবং স্থানীয়দের অনুরোধ করেছে, কোনো সন্দেহজনক ব্যক্তি বা কার্যকলাপ চোখে পড়লে তা দ্রুত থানায় জানানোর জন্য।
ফার্মগেট ও রাজাবাজারের মতো ব্যস্ত এলাকায় এমন বিস্ফোরণ রাজধানীবাসীর মনে নতুন করে নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা তৈরি করেছে। নাগরিকদের প্রত্যাশা—দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন আর না ঘটে।