পার্বত্য সংকটের মূল শিকড়ে মুজিবের হুমকি: আবু রুশদ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬২ বার
ChatGPT said: পার্বত্য সংকটের মূল শিকড়ে মুজিবের হুমকি: আবু রুশদ

“স্বাধীনতার পর শেখ মুজিব পাহাড়ে গিয়ে উপজাতিদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমাদের উপজাতি থেকে জাতিতে উন্নীত করলাম, আজ থেকে তোমরা বাঙালি জাতি।’ কিন্তু পার্বত্য নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তৎক্ষণাৎ এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জানান, ‘আমরা বাঙালি নই, চাকমা; তবে আমরা বাংলাদেশের নাগরিক।’ এর পর শেখ মুজিব হুমকি দিয়ে বলেন, ‘তোদের অস্ত্র দিয়ে মারব না, তুড়ি দিলেই মরে যাবি—ছয়-দশ লাখ বাঙালি ঢুকিয়ে দিলেই যথেষ্ট।’” আবু রুশদের দাবি, এই বক্তব্য থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতিগত উত্তেজনা ও সংঘর্ষের সূচনা হয়। প্রকৃত পক্ষে পার্বত্য অস্তিরতায় পেচনে কি কারণ। আসলেই কি তাই। নাকি জাতি হিসাবে তারাই তাদের ভিন্ন সঙ্গস্কৃতি ভিন্ন মতাদর্শে সম্পুর্ন্ন আলাদা হয়ে বাঁচতে চায় এতে লাভ কার”

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিআইডিএসএস)-এর আয়োজিত অনলাইন ওয়েবিনারে “চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের সংকট এবং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা” বিষয়ক আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, স্বাধীনতার পরপরই রাষ্ট্রের ভুল রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ভিত্তি তৈরি করে। আলোচনায় অংশ নিয়ে ইনস্টিটিউশন অব স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড ট্যাকটিকস রিসার্চ-এর প্রেসিডেন্ট আবু রুশদ বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের তৎকালীন হুমকিমূলক বক্তব্যই পার্বত্য চট্টগ্রামের সহিংসতার সূচনা ঘটায়।আলোচনায় তিনি আরও বলেন, “একটি গোষ্ঠী মনে করে পাহাড় থেকে উপজাতিদের বিতাড়ন করতে হবে, আবার অন্য একটি গোষ্ঠী সেনা প্রত্যাহারের দাবি তোলে—দুই ধারণাই ভুল ও ক্ষীণদৃষ্টিসম্পন্ন।” তিনি মনে করেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যু মোকাবেলায় রাজনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতিক পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। তিনি সতর্ক করে বলেন, “বাংলাদেশ যদি সময়মতো কূটনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট না করে, তাহলে সীমান্তের ভেতরে বার্মা অ্যাক্টের মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

”ইতিহাসগতভাবে পার্বত্য এলাকায় বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠী (চাকমা, মারমা, বান্দরব্রী, ত্রিপুরা প্রভৃতি) তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও আদিবাসী ভূমি-জমির ঐতিহ্য নিয়ে বসবাস করেছে। বরাবরই এই অঞ্চলের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দূরত্ব, সীমান্তে আলাদা রাজনৈতিক সম্পর্ক ও স্বায়ত্তশাসন নিয়ে বিবিধ দাবি ছিল। স্বাধীনতার পর দ্রুত বদলানো প্রশাসনিক নীতিমালা, ভূমিসংক্রান্ত নীতি ও অনাবাসী বসতি–কেন্দ্রিক পদক্ষেপ স্থানীয় জনজীবনে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে পাহাড়ি ভূমিতে অনিয়ন্ত্রিত বসতি বা রেজিস্ট্রেশন-রেকর্ড, ভূমি বার্ধক্য, এবং স্থানান্তরিত মানুষের আগমন—এসব দায়বদ্ধভাবে সমাধান না হলে ক্ষোভ জমে যায়।

একই দেশের অংশ হলেও পার্বত্য এলাকা রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন, শিক্ষা, আয় ও সুযোগ থেকে প্রায়শই পিছিয়ে পড়েছে বলে অনুভব করে অনেকেই। স্থানীয় অধিকার, সম্পদ-বণ্টন ও চাকরি-সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘকালীন অনুপস্থিতি অসন্তোষ বাড়িয়েছে। ফলে প্রতিরোধ বা আলাদা কর্তৃত্ব দাবির রাজনৈতিক মাধ্যেম বহু সময় শক্তিশালী হয়েছে।

আফিম-রাজনৈতিক কৌশল, সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ও প্রতিরোধেও এই সমস্যা জটিল হয়েছে। যারা তালবাহানা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে—তাদের মধ্যে কিছু অংশ আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে গড়েছে, আবার কিছু অংশ বাহ্যিক সমর্থন বা রাজনৈতিক লাভের আশায় শক্তি পেয়েছে। ১৯৭০–১৯৯০ সালের মতো সময়গুলোতে অস্ত্রধারী সংঘাত ও রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল—যার মধ্যে রাজনীতিক কারণ, জমি ও নির্যাতন অভিযোগ, ও বাহ্যিক দখলের আশঙ্কা জড়িয়ে ছিল। ১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তি প্রধান মোড় ছিল, কিন্তু তার বাস্তবায়নের ত্রুটি ও প্রতিশ্রুতি পূরণে বিলম্বর ফলে পুনরায় ক্ষোভ জাগে।

তাহলে কারা বেশি লাভবান হয়—এই ধরণের সংঘাত থেকে? সংঘাত সহজভাবে “কেউ লাভ করে, কেউ হারায়” ধরার মতো নয়, কিন্তু বাস্তবে কিছু গ্রুপ অপ্রত্যক্ষভাবে সুবিধা পেতে পারে। স্থানীয় ভায়না বা মদতদাতা রাজনৈতিক ঐতিহ্যসূত্রে কিছু রাজনৈতিক বা সামরিক গোষ্ঠী স্থানীয় ক্ষমতা বা আদায় বৃদ্ধি করতে পারে; ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট বা অনিয়ন্ত্রিত ভূমি দখলকারীরা অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে; কিছু রাজনৈতিক দলের দায়িত্বজ্ঞানহীন কৌশল পরিস্থিতি সজীব রাখলে তারা ভোটব্যাংক বা সমর্থন ধরে রাখতে সক্ষম হতে পারে। আবার বাহ্যিক কৌটনৈতিক বা সীমান্তীয় স্বার্থও কখনো কখনো অস্তিরতা বাড়ায়—এগুলো প্রণীত বা আস্তরণে থাকা নীতি-ফলাফল থেকে উপকৃত হতে পারে। সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সুবিধা প্রত্যক্ষভাবে আলাদা গোষ্ঠীকে না-ও পৌঁছতে পারে, কিন্তু সংঘাত চলাকালে তৎপর প্রভাবশালী এলিট, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক মধ্যস্তরা, কিংবা বাহ্যিক হস্তক্ষেপকারীরা) তুলনামূলকভাবে সুবিধা পেতে দেখা যায়।

তাছাড়া সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার দাবি স্বতন্ত্র ও যৌক্তিক। উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর অনেকের জন্য নিজস্ব ভাষা, ধর্ম, বসবাস পদ্ধতি ও সমাজরীতি রক্ষা করা জীবনের জরুরি অংশ; তারা কেবল আলাদা দেশ বা স্বাধীন রাষ্ট্রই চায় না—অনেকেই চান নিজস্ব ঐতিহ্য ও ভূমি সংরক্ষিত রেখে মর্যাদাভিত্তিক নাগরিক অধিকার ও উন্নয়ন পান। সুতরাং “তারা আলাদা থাকতে চায়, অর্থাৎ বিচ্ছিন্নতা চায়”—এমন একমাত্রীকরণও বাস্তবিকভাবে ঠিক নয়; অধিকাংশ সময় চাই থাকে স্বীকৃতি, নিরাপত্তা ও ন্যায্য সুযোগ পেতে।

অবশেষে সমাধানের পথও বহুস্তরীয়: বিশ্বাস পুনর্নির্মাণ, শান্তি চুক্তির প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন, ভূমি ও আইনি অধিকার সমাধান, স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বৃদ্ধি, সেনাবাহিনী ও সিভিল প্রশাসনের ভূমিকা সুস্পষ্টভাবেই সমন্বয় করা এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক সমন্বয় বজায় রাখা—এসব মিলিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষের তদারকি, স্থানীয় নেতৃত্বকে ক্ষমতায় আনতে উদ্যোগ, এবং সাংস্কৃতিক-শিক্ষামূলক কর্মসূচি—এগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

সংক্ষেপে বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের উদ্বেগের মূল কারণ ইতিহাস, ভূমি-নীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি ও কেতাদুরস্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমন্বয়ের অভাব। এককভাবে একটি “হুমকি বক্তব্য” বা “সংস্কৃতি ভিন্নতা” কেবলই দায়ী নয়; কারণগুলো জটিল ও আন্তঃনির্ভর। ফলস্বরূপ, সমাধানও বহুমাত্রিক—আইনগত, রাজনৈতিক, মানবিক ও অর্থনৈতিক স্তরে একযোগে কাজ না করলে সমস্যার প্রকৃত গভীরতা থেকে বেরোনো কঠিন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত