প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কলেজছাত্র মো. হৃদয়কে হত্যা করে তাঁর মরদেহ কড্ডা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ এ চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন। আজ সোমবার ট্রাইব্যুনালে দ্বিতীয় দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে তিনি বলেন, হৃদয়ের মরদেহ উদ্ধারের জন্য ডুবুরি নামানো হয়েছিল, কিন্তু স্রোতের কারণে কিছুই পাওয়া যায়নি।
হৃদয় ছিলেন টাঙ্গাইলের গোপালপুরের আলমগর গ্রামের লাল মিয়ার ছেলে। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি কোনাবাড়ী এলাকায় অটোরিকশা চালাতেন। গণ-অভ্যুত্থানের সময় এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে দুই দিন ধরে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হচ্ছে। আজ হৃদয় হত্যার বিষয়টিও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়।
ট্রাইব্যুনালে একটি ভিডিও দেখানো হয়, যেখানে স্পষ্টভাবে দেখা যায় পুলিশের কয়েকজন সদস্য হৃদয়কে আটক করেছেন। পুলিশের সদস্যরা রাস্তার ওপর তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ একটি পুলিশ সদস্য হৃদয়কে গুলি করে। হৃদয় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে পুলিশের দু-তিনজন সদস্য এসে তাঁকে টেনে নিয়ে যান। ভিডিও প্রমাণের ভিত্তিতে তাজুল ইসলাম জানান, হত্যার ঘটনায় অংশ নেওয়া সেই পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে এবং তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
চিফ প্রসিকিউটর আরও জানান, “হৃদয়ের মরদেহ গাড়িতে তুলে রাতে ব্রিজের ওপর থেকে কড্ডা নদীর মাঝখানে ফেলে দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের স্বীকারোক্তি রয়েছে। মরদেহ উদ্ধারের জন্য ডুবুরি নামানো হয়েছিল। যেহেতু এক বছর পর এবং নদীর স্রোত প্রবল ছিল, তাই কোনো কিছুই পাওয়া যায়নি।”
গ্রেপ্তার ওই কনস্টেবল মো. আকরাম হোসেন (২২) গাজীপুর শিল্প পুলিশের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ আনা হয়েছে যে, তিনি হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন। আদালতের কার্যক্রমে তাঁর জবানবন্দি এবং ভিডিও প্রমাণ আদালতের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা মামলার প্রমাণ সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এই হত্যাকাণ্ড স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সামাজিক ও মানবিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। হত্যাকাণ্ডের সরাসরি প্রমাণ হিসেবে প্রদর্শিত ভিডিও, স্বীকারোক্তি এবং আদালতে উপস্থাপিত তথ্যগুলো শুধু আদালতের জন্য নয়, সাধারণ মানুষকেও এ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করাচ্ছে।
ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, “হৃদয়ের হত্যাকাণ্ড গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হয়েছিল এবং এটি মানবতাবিরোধী অপরাধের এক অংশ। আমাদের লক্ষ্য নিশ্চিত করা যে, অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।” এই মামলার প্রসঙ্গে প্রসিকিউশন দল উল্লেখ করেছে যে, হত্যাকাণ্ডের পেছনের নেপথ্য কারণ ও পরিকল্পিততা বিচারিক প্রক্রিয়ায় উঠে আসবে।
হৃদয় হত্যার ঘটনায় তার পরিবার গভীর শোকাহত। আত্মীয়রা দাবি করেছেন, “হৃদয় এক সৎ এবং শ্রমসাধ্য তরুণ ছিলেন। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডে আমরা স্তম্ভিত। আশা করি আইনের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।” স্থানীয়রা জানান, এই ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি দেয় এবং সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
মামলার প্রসঙ্গেও বলা হয়, এই হত্যাকাণ্ড শুধু এক ব্যক্তির ওপর সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দেশের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শিত ভিডিও এবং স্বীকারোক্তি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমকে আরও দৃঢ় করছে।
এই হত্যাকাণ্ডের বিচার ও তদন্তের মাধ্যমে দেশের আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা প্রদর্শিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের নৃশংস মানবতাবিরোধী অপরাধ রোধ করা সম্ভব হবে।