বিএনপির প্রার্থী বাছাই শেষ পর্যায়ে, সিলেট বিভাগের দায়িত্বে মির্জা ফখরুল

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬৫ বার
ফখরুলের সঙ্গে বৈঠকে সুনামগঞ্জ বিএনপি নেতাদের হট্টগোল

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রহর ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি এখন প্রার্থী নির্ধারণের শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা, মতবিনিময় ও মূল্যায়নের পর দলটি প্রাথমিক খসড়া প্রার্থী তালিকা প্রণয়নের কাজ প্রায় শেষ করেছে। দেশের নয়টি বিভাগকে আলাদা আলাদা করে ভাগ করে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা আগ্রহী প্রার্থীদের সঙ্গে একাধিক দফা বৈঠক করে তাদের যোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা ও নির্বাচনি সক্ষমতা যাচাই করছেন।

দলের সূত্রে জানা গেছে, এই পুরো প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যিনি লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি তদারকি করছেন। তার নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের টিম এই প্রাথমিক তালিকা তৈরির দায়িত্বে। এই টিমে রয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন এবং সালাহ উদ্দিন আহমেদ। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তারেক রহমান ঢাকাসহ চট্টগ্রাম বিভাগের প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনার দায়িত্বে, মির্জা ফখরুল সিলেট ও খুলনা বিভাগ দেখছেন, নজরুল ইসলাম খান রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ, জাহিদ হোসেন কুমিল্লা ও বরিশাল, আর সালাহ উদ্দিন আহমেদ ময়মনসিংহ বিভাগের দায়িত্বে আছেন।

একাধিক আগ্রহী প্রার্থীর সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা প্রতিটি আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেছেন। কেউ কেউ ভার্চুয়াল মিটিংয়ে অংশ নিয়েছেন, আবার কেউ সরাসরি সাক্ষাৎ করেছেন। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিটি আসনে চূড়ান্তভাবে একজন প্রার্থীই মনোনয়ন পাবেন। বাকিদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দায়িত্বে সুযোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দলীয় নেতারা বলছেন, এবারের প্রার্থী বাছাইয়ে বিএনপি ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। দলীয় ঐক্য ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ২০১৮ সালের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই এবার আগেভাগেই প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করছে দলটি। প্রাথমিক তালিকা তৈরি হলেও চূড়ান্ত মনোনয়ন প্রকাশে বিএনপি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। দলের অভ্যন্তরীণ কৌশল অনুযায়ী, শেষ সিদ্ধান্ত নেবেন তারেক রহমান নিজে, পরিস্থিতি ও নির্বাচনি বাস্তবতা বিবেচনা করে।

স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, “এই প্রক্রিয়াটা খুবই স্বাভাবিক। বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। এখানে একাধিক প্রার্থী থাকবেই, প্রতিযোগিতা থাকবে, উদ্দীপনা থাকবে। তবে শেষ পর্যন্ত যাকে ফিট মনে করা হবে, যিনি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ও জয়ের সম্ভাবনা রাখেন, তাকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে। অন্যরা তার পাশে থাকবেন।”

দলের ভাইস চেয়ারম্যানদের একজন জানান, “এইবার তরুণ নেতৃত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। যারা মাঠে সক্রিয়, আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য— তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।”

দলের একজন কেন্দ্রীয় নেতা জানান, প্রাথমিক তালিকা তৈরির পর তা স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা হবে। এরপর যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর সঙ্গে আসন সমন্বয়ের ভিত্তিতে দ্বিতীয় পর্যায়ের তালিকা তৈরি করা হবে। বিএনপি এখন পর্যন্ত অন্তত তিন স্তরে তালিকা সাজানোর প্রস্তুতি নিয়েছে— এক, আগ্রহী প্রার্থীদের তালিকা; দুই, স্থায়ী কমিটির যাচাই-বাছাইয়ের তালিকা; এবং তিন, জোট শরিকদের সঙ্গে সমন্বয়ের তালিকা।

জানা গেছে, জোটভুক্ত কয়েকটি দলের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি নিয়ে ইতোমধ্যে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক জেএসডি ৩টি, গণসংহতি আন্দোলন ১টি, নাগরিক ঐক্য ২টি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ১টি, ভাসানী জনশক্তি পার্টি ১টি, গণঅধিকার পরিষদ ২টি, এনডিএম ১টি, গণফোরাম ২টি এবং ১২ দলীয় জোট ৫-৬টি আসন পেতে পারে বলে আলোচনায় উঠে এসেছে। যদিও এসব বিষয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি।

একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, “এবারের নির্বাচনে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জামায়াত ইস্যু। বিরোধী আসনগুলোতে জামায়াত যাতে না বসতে পারে, সেটা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য বিকল্প শক্তি হিসেবে এনসিপিকে শক্তিশালী করা হচ্ছে। তাদের কয়েকজন প্রার্থীকে জেতানোর লক্ষ্যেই বিএনপি কিছু আসন ছাড়তে পারে।”

বিএনপির ভেতরেও নির্বাচনি কৌশল নিয়ে নানা আলোচন চলছে। কেউ কেউ মনে করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং আন্দোলন থেকে নির্বাচনে রূপান্তর ঘটানোই এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ। দলের সিনিয়র নেতারা মনে করছেন, এই পরিস্থিতিতে তরুণ ও জনপ্রিয় মুখগুলোকে অগ্রাধিকার দিলে দলের ভাবমূর্তি ইতিবাচকভাবে প্রতিফলিত হবে।

দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, “নির্বাচনি সমীকরণ এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি। সময় লাগবে। নতুন জোট, নতুন সমীকরণ— সবকিছু বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।”

বিএনপির আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, “আসন বণ্টন বা প্রার্থী নির্ধারণের সময় এখনও আসেনি। প্রথমে নির্বাচন কীভাবে হবে— অংশগ্রহণমূলক নাকি একতরফা— সেটি নিশ্চিত হতে হবে। এরপরই আমরা বুঝতে পারব কোন আসনে কে লড়বেন।”

দলের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, খালেদা জিয়ার সরাসরি অংশগ্রহণ না থাকলেও তাঁর পরামর্শ এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখবে। কিছু আসনে তিনি নিজের পছন্দের প্রার্থীকেও সুপারিশ করতে পারেন। তবে সর্বশেষ সিদ্ধান্ত নেবেন তারেক রহমান, যিনি পুরো প্রক্রিয়া ভার্চুয়ালি তদারকি করছেন।

বিএনপির দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অনুশীলন ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের ঐতিহ্য অনুসারে এবারও প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যেই সম্পন্ন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সব মিলিয়ে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রার্থীদের খসড়া তালিকা চূড়ান্ত করে সংসদীয় বোর্ডে জমা দেওয়া হবে। এরপরই শুরু হবে নির্বাচনি মাঠে বিএনপির আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি।

দলীয় নেতারা আশা করছেন, এ বছরের নির্বাচন বিএনপির জন্য একটি নতুন সূচনা হয়ে উঠবে— যেখানে নতুন মুখ, নতুন কৌশল এবং ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্বের মাধ্যমে দল আবারও জাতীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে পারবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত