প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক / একটি বাংলাদেশ অনলাইন
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর সদর দপ্তরে এক উষ্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং সংস্থাটির মহাপরিচালক ড. কু ডংইউর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। সোমবার (১৩ অক্টোবর) রোমে এফএও সদর দপ্তরে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই পক্ষের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তা, টেকসই কৃষি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং গ্রামীণ উন্নয়ন সংক্রান্ত নানা বিষয়ে গভীর আলোচনা হয়।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এফএও সদর দপ্তরে পৌঁছালে সংস্থাটির মহাপরিচালক নিজেই প্রধান ফটকে এসে তাকে স্বাগত জানান। আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুযায়ী এই উষ্ণ অভ্যর্থনা ছিল বিশেষ তাৎপর্যময়। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী আনুষ্ঠানিক বৈঠক, যেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি দল ও এফএও’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বৈঠকে বাংলাদেশের কৃষি খাতের আধুনিকায়ন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির টেকসই উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ড. ইউনূস বলেন, “বাংলাদেশ এমন এক দেশে পরিণত হয়েছে, যেখানে কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যম নয়, বরং দারিদ্র্য দূরীকরণ ও কর্মসংস্থানের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। আমরা চাই কৃষিকে কেন্দ্র করেই টেকসই উন্নয়নের নতুন ধারা তৈরি হোক।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকার কৃষক-কেন্দ্রিক নীতি প্রণয়ন, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে লবণাক্ততা, খরা ও বন্যা মোকাবিলায় নতুন জাতের ধান ও সবজি চাষে গবেষণা জোরদার করা হয়েছে।
এফএও মহাপরিচালক ড. কু ডংইউ বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উন্নয়নে সাম্প্রতিক সাফল্যের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে অন্যতম উদাহরণ, যেখানে সীমিত সম্পদ নিয়েও খাদ্য উৎপাদনে বিপ্লব ঘটেছে। আমরা চাই এই অভিজ্ঞতা বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও ছড়িয়ে দিতে।”
তিনি আরও বলেন, এফএও বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারিত্ব আরও গভীর করতে আগ্রহী। বিশেষ করে স্মার্ট এগ্রিকালচার, যুবসমাজের কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে সম্পৃক্ততা এবং ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থাপনা নিয়ে যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে উভয় পক্ষের মধ্যে আরও আলোচনা হয় জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে কৃষি খাতের ভূমিকা নিয়ে। ড. ইউনূস বলেন, “খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন মানেই শুধু পেট ভরে খাওয়া নয়, বরং পুষ্টি ও সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা। এজন্য দরকার শিক্ষা, সচেতনতা এবং নারী-পুরুষ উভয়ের সমান অংশগ্রহণ।”
প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস এ সময় বাংলাদেশের সফল সামাজিক ব্যবসা মডেল এবং ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের অভিজ্ঞতাও শেয়ার করেন, যা বিশ্বের বহু দেশে দারিদ্র্য বিমোচনে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি জানান, “বাংলাদেশের জনগণ নিজেরাই উন্নয়নের মূল চালিকা শক্তি। আমরা শুধু সুযোগ তৈরি করে দেই—তারা নিজেরাই সাফল্যের গল্প লেখে।”
বৈঠক শেষে এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, এফএও ও বাংলাদেশ সরকার একসঙ্গে কাজ করবে কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন, খাদ্য অপচয় হ্রাস এবং নারী কৃষকদের সক্ষমতা উন্নয়নে। এছাড়া কৃষি উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরেও নতুন কর্মসূচি নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকের শেষে ড. কু ডংইউ প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেল আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে দেশটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে—এটি আন্তর্জাতিকভাবে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”
রোমে অনুষ্ঠিত এই সাক্ষাৎকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল গুরুত্ব সহকারে দেখছে। কারণ, এটি শুধু বাংলাদেশ ও এফএও’র দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককেই শক্তিশালী করেনি, বরং বৈশ্বিক খাদ্য ও কৃষি নীতিতেও বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে।
বৈঠক শেষে ড. ইউনূসকে এফএও সদর দপ্তরের স্মারক উপহার দেওয়া হয়। তিনি মহাপরিচালক ও কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, বিশ্ব যদি একসঙ্গে কাজ করে—তাহলে কোনো দেশেই ক্ষুধা থাকবে না, থাকবে শুধু সুযোগ ও সম্ভাবনা।”