প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর আবারও আলোচনায়। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯২ শতাংশেরও বেশি যেখান দিয়ে সম্পন্ন হয়, সেই বন্দরকে ঘিরে এখন ব্যবসায়ী মহলে সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের উদ্বেগ। কারণ, মঙ্গলবার রাত ১২টার পর থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন মাশুল বা ট্যারিফ। সরকারি ভাষায় এটি ‘দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমন্বয়’, কিন্তু ব্যবসায়ীদের কাছে এটি একটি অপ্রস্তুত আঘাত—যা তাদের মতে বাণিজ্য ব্যয় বাড়িয়ে আমদানি-রপ্তানির গতি শ্লথ করবে, এমনকি পণ্যের দামে ভোক্তা পর্যায়েও প্রভাব ফেলবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) হিসাব বলছে, গত অর্থবছরে বন্দরের আয় ছিল ৫ হাজার ২২৭ কোটি টাকা। ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, মুনাফা এসেছে ২ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। আগের বছর এই মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৯১২ কোটি টাকা। অর্থাৎ, প্রতি বছরই বন্দর বিপুল লাভ করছে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই ধারাবাহিক মুনাফা থাকা সত্ত্বেও বন্দর কর্তৃপক্ষ নতুন করে মাশুল বাড়িয়ে ব্যবসায়িক পরিবেশকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
বন্দর সচিব ওমর ফারুক অবশ্য এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, “১৯৮৬ সালের পর থেকে বন্দরের মাশুল আর বাড়ানো হয়নি। প্রায় চার দশক পর এই সমন্বয় করা হচ্ছে। এটি একটি বাস্তবতার প্রতিফলন। ব্যবসায়ীরা যে দাবি করছেন, এতে ভোক্তাদের ওপর চাপ পড়বে—তা পুরোপুরি সঠিক নয়।” তাঁর মতে, বন্দরের সেবার মান উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করা হচ্ছে, ফলে মাশুল বাড়ানোই ছিল সময়ের দাবি।
তবে ব্যবসায়ীদের যুক্তি ভিন্ন। তারা বলছেন, বিদেশি অপারেটর ও শিপিং কোম্পানিগুলো নতুন মাশুল কার্যকর হওয়ার আগেই চার্জ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে, যা বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। মায়ের্সক শিপিং লাইন উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়—আগে ২০ ফুট কনটেইনারের টার্মিনাল হ্যান্ডলিং চার্জ ছিল ১২০ ডলার, এখন সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬০ ডলারে। ৪০ ফুট কনটেইনারের ক্ষেত্রে ২০৫ ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ৩১০ ডলার। অর্থাৎ, প্রতিটি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে বাড়তি ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৪৫ থেকে ১০৫ ডলার পর্যন্ত। একইভাবে সিএমএ, সিজিএম, সিএনসি ও এএনএলসহ আরও কয়েকটি কোম্পানি চার্জ বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে।
বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ফাইয়াজ খন্দকার বললেন, “এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ছোট নয়। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বাণিজ্য প্রবাহের মেরুদণ্ড। এখানে যদি অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ে, তাহলে সেটির অভিঘাত পড়বে পুরো অর্থনীতিতে। অনেক রপ্তানিকারক প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না।”
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরীর মতে, বিদেশি অপারেটররা যেহেতু টার্মিনাল পরিচালনা করে, তাই তাদের স্বার্থেই ট্যারিফ বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, “এই সিদ্ধান্তের আগে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতামত নেওয়া হয়নি। আমরা চাই, এই সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে পুনর্বিবেচনা করা হোক।”
বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক আরও সরাসরি অভিযোগ করেছেন, “বন্দরের মাশুল বাড়ানো মানে বিদেশি অপারেটরদের সুবিধা দেওয়া। অথচ এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশীয় ব্যবসায়ীরা। আমদানি-রপ্তানি খরচ বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপরই পড়বে।”
বন্দরের ভেতরের বাস্তবতাও ভিন্ন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ওঠানামার পরিমাণ বেড়েছে কয়েকগুণ। নতুন টার্মিনাল, কন্টেইনার ইয়ার্ড ও আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ চলছে। এসব উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন। বন্দর কর্তৃপক্ষের যুক্তি, মাশুল বাড়ানো ছাড়া সেই বিনিয়োগের অর্থ জোগাড় সম্ভব নয়।
তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত না করে কেবল মাশুল বাড়ানো একটি স্বল্পদৃষ্টি নীতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদদের মতে, এমন পদক্ষেপের ফলে রপ্তানিমুখী শিল্প যেমন তৈরি পোশাক, ওষুধ বা হিমায়িত খাদ্য খাতের প্রতিযোগিতা ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমদানি-রপ্তানির ওপর সরাসরি প্রভাব পড়লে তা জাতীয় অর্থনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করবে। এখনই যদি ব্যয় বাড়ে, তাহলে দেশের পণ্য বিদেশি বাজারে কম প্রতিযোগিতামূলক হয়ে পড়বে।”
চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন মাশুল কার্যকর হওয়ার প্রাক্কালে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। তাদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রী বা নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান বের হবে—যাতে উন্নয়নও এগিয়ে যায়, আবার ব্যবসায়ীরাও বাঁচে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের গতি যেভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল, তাতে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব কেবল আমদানি-রপ্তানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর ঢেউ ছড়িয়ে পড়বে শিল্প, ভোক্তা বাজার, এমনকি পুরো অর্থনীতিতেই। এখন দেখার বিষয়, সরকারের এই নীতিগত সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে কতটা টিকিয়ে রাখতে পারে—নাকি এটি হয়ে উঠবে এক নতুন বাণিজ্য-সংকটের সূচনা।