প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও বিচারিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিষয়টি। সেনা হেফাজতে থাকা কর্মকর্তাদের নিয়ে নানা গুঞ্জনের মাঝে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, যেসব সেনা সদস্য বর্তমানে সেনাবাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন, তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখানো হলে আদালতে হাজির করা বাধ্যতামূলক। এরপর ট্রাইব্যুনালই নির্ধারণ করবেন, তারা সাবজেলে থাকবেন নাকি অন্য কোনো কারাগারে পাঠানো হবে। সোমবার (১৩ অক্টোবর) সময় সংবাদকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।
এর আগে, সেনা কর্মকর্তাদের গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরদিনই একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কারা-১ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, ঢাকা সেনানিবাসের একটি ভবনকে সাময়িকভাবে কারাগার ঘোষণা করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশে প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের উপসচিব মো. হাফিজ-আল-আসাদ।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ সালের ধারা ৫৪১(১) এবং The Prisons Act, 1894 (IX of 1894)-এর ধারা ৩(বি)-এর ক্ষমতাবলে ঢাকা সেনানিবাসের বাশার রোড সংলগ্ন উত্তর পাশে অবস্থিত ‘এমইএস বিল্ডিং নং-৫৪’-কে সাময়িকভাবে কারাগার ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষণায় আরও বলা হয়, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে এবং এটি অবিলম্বে কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে। যদিও প্রজ্ঞাপনে এই সাময়িক কারাগার ঘোষণার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি, তবে এটি সেনা কর্মকর্তাদের হেফাজতের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চার্জশিটে নাম আসা সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ১৫ জন বর্তমানে সেনা হেফাজতে রয়েছেন বলে জানিয়েছে সেনা সদর দপ্তর। শনিবার (১১ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকা সেনানিবাসে অনুষ্ঠিত এক ব্রিফিংয়ে সেনা সদর দপ্তরের অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামান বলেন, “সাবেক ও বর্তমান মিলিয়ে মোট ২৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে এই মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন এলপিআরে (অবসরোত্তর ছুটিতে) রয়েছেন, আর সার্ভিসে থাকা ১৫ জনকে ৯ অক্টোবরের মধ্যে সেনা সদরে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ছাড়া বাকিরা সকলেই নির্দেশনা অনুযায়ী উপস্থিত হয়েছেন।”
তিনি আরও জানান, এলপিআরে থাকা একজনসহ মোট ১৫ জন সেনা সদস্যকে বর্তমানে সেনা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, আর একজন আত্মগোপনে রয়েছেন। অন্যদিকে ৯ জন ইতোমধ্যে অবসরে গেছেন। সেনা সদর দপ্তর জানিয়েছে, ট্রাইব্যুনালের নির্দেশনা অনুযায়ী আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
এই ঘটনাপ্রবাহের সূত্রপাত গত ৮ অক্টোবর, যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আরও ৩০ জনের বিরুদ্ধে দুটি গুম মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। সেই তালিকায় রয়েছেন ডিজিএফআইয়ের (ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স) সাবেক পাঁচ প্রধানসহ ২৫ জন সেনা কর্মকর্তা। বাংলাদেশের ইতিহাসে চাকরিরত অবস্থায় এত সংখ্যক উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একসঙ্গে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি এই প্রথম, যা দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ট্রাইব্যুনালের আদেশ অনুযায়ী, অভিযুক্তদের আগামী ২১ অক্টোবরের মধ্যে গ্রেফতার করে ২২ অক্টোবর আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সময়সীমার মধ্যেই সরকার সেনা হেফাজতে থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে।
এদিকে, সেনানিবাসের একটি ভবনকে সাময়িক কারাগার হিসেবে ঘোষণা করার সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা। আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ঘোষণা সাধারণত বিশেষ নিরাপত্তা বা সংবেদনশীল মামলার আসামিদের হেফাজতের জন্যই করা হয়। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি, সেনা সদস্যদের হেফাজতের ক্ষেত্রে এই ভবনটি ব্যবহৃত হবে কি না।
চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম অবশ্য স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ট্রাইব্যুনালই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে এই সেনা কর্মকর্তারা কোথায় থাকবেন। “যেহেতু তারা এখন সেনা হেফাজতে আছেন, তাই গ্রেফতার দেখানো হলে আইন অনুযায়ী তাদের আদালতে হাজির করতে হবে। এরপর ট্রাইব্যুনাল নির্ধারণ করবে, তারা সাবজেলে থাকবেন নাকি অন্য কোনো কারাগারে,” বলেন তিনি।
আইনি বিশ্লেষকদের মতে, সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এটি শুধু বিচারিক কাঠামোতেই নয়, বরং সামরিক প্রতিষ্ঠান ও বেসামরিক প্রশাসনের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
এখন সবার নজর ২১ অক্টোবরের দিকে—কতজন অভিযুক্ত সেনা সদস্যকে আদালতে হাজির করা যায়, এবং তাদের হেফাজত সংক্রান্ত বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামোর পরবর্তী দিকনির্দেশনা।