এফএও সম্মেলন শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৫
  • ১১৫ বার
এফএও সম্মেলন শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) আয়োজিত বার্ষিক ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরামে অংশগ্রহণ শেষে দেশে ফিরেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বুধবার (১৫ অক্টোবর) ভোরে তাঁকে বহনকারী বিমানটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এ সময় বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং কূটনৈতিক কর্মকর্তারা।

ড. ইউনূস গত রবিবার ইতালির রাজধানী রোমে পৌঁছান, যেখানে তিনি এফএও সদর দপ্তরে আয়োজিত ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরামের প্রধান বক্তা হিসেবে অংশ নেন। রোম ফিউমিসিনো বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান ইতালিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এটিএম রোকেবুল হক এবং দূতাবাসের কর্মকর্তারা। সফরকালে তিনি শুধু সম্মেলনেই নয়, বরং বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য বিমোচন বিষয়ক বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেন।

এফএও আয়োজিত এবারের ফোরামের মূল প্রতিপাদ্য ছিল—Feeding the Future: Sustainable Solutions for a Hunger-Free World। উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে ড. ইউনূস তাঁর ভাষণে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে ছয় দফা প্রস্তাবনা পেশ করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে সামাজিক ব্যবসা, কৃষি-উদ্ভাবন, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, নারীর ক্ষমতায়ন, তরুণদের কৃষিতে সম্পৃক্ততা এবং টেকসই খাদ্যশৃঙ্খলা গঠনের প্রয়োজনীয়তা।

তিনি বলেন, “মানবজাতির টিকে থাকার জন্য খাদ্য শুধু প্রয়োজন নয়, এটি মানবিক মর্যাদার অন্যতম প্রতীক। আমরা যদি খাদ্য উৎপাদনের ন্যায্য কাঠামো ও বণ্টনের সঠিক পদ্ধতি নিশ্চিত করতে না পারি, তবে দারিদ্র্য ও বৈষম্য কখনোই দূর হবে না।” তাঁর এই আহ্বান ফোরামের উপস্থিত আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের মধ্যে গভীর সাড়া ফেলে।

ড. ইউনূস আরও উল্লেখ করেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কৃষি খাতের পুনরুত্থান ঘটাতে হলে তরুণ প্রজন্মকে কৃষিতে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, “শুধু কৃষক নয়, তরুণ উদ্ভাবকরাও আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ রচনা করবে। তাদের হাতে দিতে হবে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও ন্যায্য বাজার সুবিধা।”

ফোরামে অংশ নেওয়া বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং গবেষকরা তাঁর বক্তব্যকে অত্যন্ত অনুপ্রেরণামূলক বলে মন্তব্য করেন। এফএওর মহাপরিচালক কু ডংইউ বলেন, “ড. ইউনূস সামাজিক উদ্ভাবন ও মানবিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর প্রস্তাবিত দিকনির্দেশনা খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উন্নয়নের নীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।”

রোমে অবস্থানকালে ড. ইউনূস ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা, জিবুতির প্রধানমন্ত্রী আবদুলকাদির কামিল মোহাম্মদ, এবং রোমের মেয়র রবার্তো গুয়ালতির সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা, জলবায়ু অভিযোজন, দারিদ্র্য নিরসনে উদ্ভাবনী উদ্যোগ এবং বাংলাদেশের কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ে আলোচনা হয়।

বিশেষ করে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে কৃষি উন্নয়ন সহযোগিতা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। লুলা দা সিলভা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সামাজিক উদ্যোগভিত্তিক নীতি ও কৃষি খাতে উদ্ভাবনী চিন্তাধারাকে প্রশংসা করেন।

জিবুতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় ড. ইউনূস আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র কৃষকদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের প্রস্তাব দেন। তিনি উল্লেখ করেন, “ক্ষুধামুক্ত পৃথিবীর পথে এক দেশের সাফল্য অন্য দেশের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে। বৈশ্বিক সহযোগিতা ছাড়া টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।”

এ ছাড়া রোমের মেয়র রবার্তো গুয়ালতির সঙ্গে বৈঠকে নগর কৃষি (Urban Agriculture) ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে খাদ্য উৎপাদনের উদ্ভাবনী মডেল নিয়ে আলোচনা হয়। মেয়র রোমে বিদ্যমান ‘গ্রিন রুফ প্রজেক্ট’ এবং নগর চাষাবাদের সফল দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। ড. ইউনূস বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় নগর কৃষি সম্প্রসারণে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরামে বাংলাদেশের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও আলোচিত হয়। বিবিসি, রয়টার্স ও আল জাজিরাসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার অংশগ্রহণকে “নতুন উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গির বার্তা” হিসেবে উল্লেখ করেছে। তারা বলেছে, সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার যে মডেল বাংলাদেশ উপস্থাপন করছে, তা বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রশংসিত হচ্ছে।

ফোরামের শেষ দিনে ড. ইউনূস বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ নিয়েও কথা বলেন। তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের কৃষি খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু কৃষকদের আয় বাড়েনি। তাই আন্তর্জাতিক সহায়তা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে কৃষকদের টেকসই উন্নয়নের সুযোগ দিতে হবে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ শুধু খাদ্য উৎপাদনের দেশ নয়, বরং খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক উদ্ভাবনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে চায়।”

মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) রোমের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে ফিউমিসিনো বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন ড. ইউনূস। প্রায় নয় ঘণ্টার উড়োজাহাজ ভ্রমণের পর বুধবার ভোরে তিনি দেশে পৌঁছান। বিমানবন্দরে আগত সাংবাদিকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপে তিনি জানান, “ফোরামে বাংলাদেশের ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবে খুবই ইতিবাচকভাবে গৃহীত হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য বিমোচনের যে নতুন দিগন্ত খুলছে, তাতে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হবে।”

ড. ইউনূসের এই সফরকে অনেকেই বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে থাকা অবস্থায় তাঁর এই প্রথম বড় আন্তর্জাতিক সফর এটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সফর শুধু খাদ্য নিরাপত্তা বা উন্নয়ন নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বহু আলোচনার পর দেশে ফিরে প্রধান উপদেষ্টা এখন অভ্যন্তরীণ নীতি ও প্রশাসনিক সংস্কার কার্যক্রমে মনোযোগ দেবেন বলে জানা গেছে। সরকার সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, তাঁর এই আন্তর্জাতিক সফরে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্য এবং সামাজিক উন্নয়ন নীতিতে নতুন দিক নির্দেশনা যোগ করবে।

ইতালির রোম থেকে ফিরেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস, কিন্তু তাঁর উচ্চারিত বার্তা এখনো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মহলে—ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নয়, মানবিক সহযোগিতা ও উদ্ভাবনই পারে পৃথিবীকে বাঁচাতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত