প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার সাম্প্রতিক মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেছেন, সরকার পরিবর্তন হলে সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আর দেশে থাকবেন না। এদের মধ্যে বেশিরভাগেরই রয়েছে বিদেশি নাগরিকত্ব বা বিদেশে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ।
সম্প্রতি এক বেসরকারি টেলিভিশনের টক শোতে অংশ নিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, “এই সরকারটা পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যেই দেখবেন অনেকেই আর বাংলাদেশে নাই। তারা যেই মুহূর্তে শপথ নিয়েছেন, সেই সময় তাদের মাথায় কি ছিল জানি না। আর যাদের ডুয়েল সিটিজেনশিপ নাই, তাদের মেজরিটির ছেলেমেয়েরাই বাইরে সেটেল।”
তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ এটিকে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা’ হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে বলছেন, এটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য।
রুমিন ফারহানা আলোচনায় আরও বলেন, “সেফ এক্সিটের আসলে বেশ কয়েকটা অর্থ আছে। ওয়ান ইলেভেনের সময় কিছু মানুষ রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে নানান অপকৌশল নিয়েছিল। মইনুদ্দিন, ফখরুদ্দিন তখন চেষ্টা করেছিলেন দুই প্রধান নেত্রীকে সরিয়ে দিয়ে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে। কিন্তু তাদের পুরো প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত তারা নিজেরাই দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। এটিও এক ধরনের ‘সেফ এক্সিট’ ছিল।”
তার মতে, আজকের পরিস্থিতিতেও অনেকের অবস্থান সেই রকমই হতে পারে। “এখন যারা অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে আছেন, তাদের অনেকেরই ডুয়েল সিটিজেনশিপ আছে। কেউ কেউ বিদেশ থেকে সরাসরি এসে দায়িত্ব নিয়েছেন। যারা বহু বছর ধরে বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন বা কর্মরত ছিলেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো সুযোগ পেলেই আবার নিজের পুরনো জীবনে ফিরে যাবেন। এটা অস্বাভাবিক নয়,” বলেন তিনি।
রুমিন ফারহানার মন্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশটি ছিল প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে। তিনি বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, আমাদের উপদেষ্টা পরিষদে যারা আছেন, তারা প্রত্যেকে তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফল ব্যক্তি। তারা সবাই আবার তাদের কাজে ফিরে যাবেন—এ কথাও তিনি বহুবার বলেছেন। তাই সরকারের মেয়াদ শেষ হলে বা রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে এদের অনেকেই আর এখানে থাকবেন না, এটি আশ্চর্যের কিছু নয়।”
তিনি আরও যোগ করেন, “যাদের বিদেশে নাগরিকত্ব আছে, তারা সহজেই ফিরে যেতে পারবেন। আবার যাদের নেই, তাদেরও পরিবার-পরিজন বিদেশে বসবাস করছে। তারা যদি কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বিপদের আশঙ্কা দেখেন, তাহলেও বিদেশে চলে যাবেন। এটা একেবারেই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যারা দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দায়িত্বে আছেন, তারা কি নিজেরা দেশ ছেড়ে যেতে পারেন? এটা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য কি না, সেটাই এখন আলোচনার বিষয়।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রুমিন ফারহানার এই মন্তব্য নতুন করে দেশের শাসন কাঠামো ও অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে যারা সরকারের উপদেষ্টা বা গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন, তাদের মধ্যে অনেকেরই বিদেশি নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগ আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিল।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, “রুমিন ফারহানা মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল হলে, অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি হঠাৎ করে দেশ ছাড়েন—এটা আমরা অতীতেও দেখেছি। ওয়ান ইলেভেনের পর যেমন অনেক রাজনীতিক বা আমলা বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। এবারও হয়তো তেমন কিছু ঘটতে পারে।”
অন্যদিকে, সরকারপন্থীরা রুমিন ফারহানার বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক কৌশল’ হিসেবে দেখছেন। এক অন্তর্বর্তী সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্র বলেছে, “যারা এখন দায়িত্বে আছেন, তারা দেশের সেবা করতে এসেছেন। তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে।”
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই লিখেছেন, “দেশের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের যদি বিদেশে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ থাকে, তাহলে তারা দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে কতটা দায়বদ্ধ?” আবার কেউ কেউ বলেছেন, “রুমিন ফারহানা যেভাবে বিষয়টি তুলেছেন, তা হয়তো রাজনৈতিক বক্তব্য, কিন্তু তার ভেতরে বাস্তবতার ছোঁয়া আছে।”
রুমিন ফারহানা তার বক্তব্যে সরকারের বর্তমান অবস্থারও সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “এই সরকারের কাজ এখনো পরিষ্কার নয়। দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি বিরাজ করছে। এমন অবস্থায় যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা যদি ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত না হন, তাহলে তাদের দেশপ্রেম নিয়েও প্রশ্ন উঠবেই।”
তিনি উল্লেখ করেন, “প্রধান উপদেষ্টা যখন আন্তর্জাতিক ফোরামে যান, তখন তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। কিন্তু দেশের জনগণ জানতে চায়, এসব সফরের বাস্তব সুফল কী? যদি সরকারের সদস্যরাই মনে করেন, একসময় তারা বিদেশে ফিরে যাবেন, তাহলে তারা কি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থে কাজ করছেন?”
রাজনৈতিক অঙ্গনে এই বক্তব্য এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। কেউ কেউ বলছেন, এটি সরকারের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার ওপর একটি যৌক্তিক প্রশ্ন। আবার অনেকে মনে করেন, রুমিন ফারহানা একজন বিরোধী দলের প্রতিনিধি হিসেবে রাজনৈতিক অবস্থান থেকেই এমন মন্তব্য করেছেন।
তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে যখনই সরকার পরিবর্তন হয়েছে, তখন কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি হঠাৎ করেই দেশের বাইরে চলে গেছেন। একসময়ের ক্ষমতাধর রাজনীতিক থেকে শুরু করে আমলা, এমনকি ব্যবসায়ী পর্যন্ত—অতীতে এমন অনেক উদাহরণ আছে।
সুতরাং, রুমিন ফারহানার মন্তব্য হয়তো রাজনৈতিক, কিন্তু তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক অস্বস্তিকর বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের জনগণ এখন নতুন করে ভাবছে—যারা আজ ক্ষমতায় আছেন, তারা কতটা এই দেশের সঙ্গে যুক্ত, এবং সরকার পরিবর্তনের পর তারা আসলেই দেশে থাকবেন কি না। এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা, তবে রুমিন ফারহানার বক্তব্য সেটি নিয়ে নতুন করে আলোচনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন বক্তব্য নতুন নয়, কিন্তু সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে দেশে চলছে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকট, অন্যদিকে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে বিদেশি নাগরিকত্বের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে এটি এখন জনআলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
রুমিন ফারহানার কণ্ঠে শোনা গেছে এক ধরনের সতর্কবার্তা—“দেশটা কার? যারা দেশ চালাচ্ছেন, তারা কি সত্যিই এই দেশের মানুষ?” এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো এখনই মিলবে না, কিন্তু আলোচনাটি যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে, তা আর অস্বীকার করার উপায় নেই।