ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কেনিয়ার বিরোধী নেতা মৃত্যুবরণ করেছেন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৪ বার
ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কেনিয়ার বিরোধী নেতা মৃত্যুবরণ করেছেন

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

কেনিয়ার বর্ষীয়ান বিরোধী নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাইলা ওডিঙ্গা ভারতের কোচি শহরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। ৮০ বছর বয়সী এই রাজনৈতিক নেতার মৃত্যু নিশ্চিত করেছেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো। রাইলা দীর্ঘ সময় ধরে কেনিয়ার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এবং একাধিক নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও বিজয়ী হতে পারেননি। মৃত্যুকালে তিনি ভারতের একটি হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন।

রাইলার রাজনৈতিক জীবন প্রায় পাঁচ দশক ধরে চলেছে। একক পার্টি শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই চালানো এই নেতা তাঁর জীবন অনেকটা কারাবাস ও রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কাটিয়েছেন। রাইলার পরিবারিক সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তিনি সাবেক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে জোট গঠন করেছেন এবং এক মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর সমর্থকরা তাঁকে বিশেষভাবে ‘বাবা’ হিসেবে সম্বোধন করতেন এবং বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলের লুও সম্প্রদায় এবং নাইরোবির সাধারণ মানুষ তাঁকে গভীরভাবে সমর্থন করত।

রাজনীতিক দক্ষতা ও সমঝোতার জন্য রাইলাকে তাঁর মাতৃভাষা লুওতে ‘আগওয়াম্বো’ বা ‘রহস্যময় ব্যক্তি’ হিসেবে অভিহিত করা হতো। তাঁর সমর্থকরা রাজনৈতিক সুবিধার জন্য জাতিগত বিভেদ ব্যবহার কিংবা বিরোধীদের সঙ্গে চুক্তি করার অভিযোগ থাকলেও রাইলাকে অবিচল সমর্থন করতেন। রাইলার মৃত্যুর খবরে নাইরোবির কিবেরা বস্তির শত শত সমর্থক তাঁর বাড়ির দিকে মিছিল করেছেন, যেখানে অনেকেই কাঁদছিলেন এবং গাছের ডাল নেড়ে অশুভ লক্ষণ দূর করার চেষ্টা করছিলেন।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাইলার অবদান অপরিসীম। তিনি ১৯৯১ সালে কেনিয়ায় বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং ২০১০ সালে নতুন সংবিধান প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ২০০৭ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর তাঁর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে দেশজুড়ে সহিংসতা দেখা দেয়, যা স্বাধীনতার পর কেনিয়ায় সবচেয়ে মারাত্মক রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা হিসেবে ধরা হয়। সেই সহিংসতায় প্রায় ১,৩০০ জন নিহত হন এবং বহু মানুষ গৃহহীন হন।

রাইলার রাজনৈতিক কেরিয়ার কারাবাস ও নির্যাতনের মধ্য দিয়েও গড়ে উঠেছে। ১৯৮২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল আরাপ মইয়ের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানচেষ্টার অভিযোগে তাঁকে প্রথমবার কারাগারে বন্দী করা হয়। মোট ৯ বছর তিনি কারাবাসে ছিলেন, যার মধ্যে ৬ বছর নিঃসঙ্গ কক্ষে বন্দী ছিলেন। রাইলার মতে, কারাবাসই তাঁর জীবন এবং রাজনীতিতে সহনশীলতা ও ক্ষমা শেখার এক ভালো স্কুল ছিল।

১৯৯২ সালে কিবেরাসহ তাঁর সংসদীয় আসনে প্রথম জয়ী হওয়ার পর ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি সেই আসন ধরে রেখেছিলেন। তাঁর উজ্জ্বল কমলা রঙের হামার গাড়ি যখনই এলাকার কর্দমাক্ত গলিতে প্রবেশ করত, স্থানীয়রা ভিড় করে তাঁর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করত। ১৯৯৭ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড্যানিয়েল আরাপ মইয়ের বিপক্ষে নির্বাচনে হেরে গেলেও রাইলার রাজনৈতিক প্রভাব কমেনি। পরবর্তীতে তিনি একটি জোট সরকার গঠন করেন, যা কিছু সমালোচকের চোখে সুবিধাবাদী হলেও তিনি তা বাস্তবসম্মত বলে দাবি করেছিলেন।

রাইলার জন্মের পটভূমিও রাজনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ। তিনি কেনিয়ার স্বাধীনতাসংগ্রামী নেতা জোমো কেনিয়াত্তার অধীন প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট ওগিঙ্গা ওডিঙ্গার ছেলে। পরিবারিক ব্যবসায়িক স্বার্থ থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে তিনি বামপন্থী নেতার পরিচয় লাভ করেছিলেন। তাঁর ছেলে ফিদেলের নামই কিউবার কমিউনিস্ট নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর সম্মানার্থে রাখা হয়েছিল।

রাইলার রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ অধ্যায়টি কেনিয়ার রাজনীতিকে নতুন দিশা দিয়েছে। তাঁর মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি শূন্যতার সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও দলীয় রাজনীতিতে তাঁর অবদান চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। রাইলার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে রাজনৈতিক নেতারা এবং সাধারণ জনগণ শোক প্রকাশ করেছেন।

রাইলার মৃত্যু শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, পুরো কেনিয়ার রাজনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষের ইঙ্গিত বহন করছে। গণতন্ত্র, রাজনৈতিক সংলাপ এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণা হিসেবে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত